নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন ফেনীর সাধারণ মানুষ। মাছ, মাংস, ডিম থেকে শুরু করে মুদি পণ্যের দামও বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
জেলার বিতরের বাজার, রেলগেট বাজার, মহিপাল কাঁচাবাজার, পাঁচগাছিয়া বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাজারেই পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে মাছ, মাংস, ডিম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বাজারে বেলে মাছ আগে প্রতি কেজি ২২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ২৬০ টাকা, রীডা মাছ ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা এবং পাঙ্গাস মাছ ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় মাঝারি আকারের রুই মাছের দামও ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০০ টাকা হয়েছে। আর ইলিশের দাম আকারভেদে প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের কারণে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। এছাড়া পথে পথে চাঁদাবাজির কারণেও মাছসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তি।
মাছ ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, একটি গাড়ি বাজারে আসা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এতে ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে মাছের দামে।
রহমান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছ পরিবহনের খরচও বেড়েছে। ফলে আগের দামে মাছ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
মাছের পাশাপাশি বেড়েছে মাংস ও ডিমের দামও। ১৪০ টাকা কেজির সাদা ব্রয়লার মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। সোনালি ও কক মুরগির দামও কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ডিম আগে প্রতি পিস ৯ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১২ টাকা।
তবে কিছুটা স্থীর রয়েছে সবজির দাম। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৫০ টাকা, মালফা ২০ টাকা, ছড়া ৪০ টাকা এবং বরবটি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকটি সবজির দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
মাছ-মাংস ও ডিমের পাশাপাশি বাড়ছে বিভিন্ন মুদি পণ্যের দাম। চিনি, গুঁড়া চাল, আটা, তেল, লবণ, ডালসহ নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।
গুঁড়া চাল আগে প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন ১৬০ টাকা। আটার দামও আগের তুলনায় কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। প্যারাসুট নারকেল তেলসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভোজ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।
রেলগেট বাজারের দোকানদার আল আমিন মিয়া বলেন, বিভিন্ন কোম্পানি পণ্যের দাম বাড়ালেও ব্যবসায়ীদের কমিশন কমিয়ে দিয়েছে। পাঁচ লিটারের রূপচাঁদা তেল কিনতে প্রায় ১ হাজার টাকা পুঁজি লাগলেও সেখানে ব্যবসায়ীদের লাভ থাকে মাত্র ৫ টাকা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। বাজারের এক ক্রেতা জনার্দন বৌদ্ধ বলেন, ‘মাছ-মাংস থেকে শুরু করে বাজারের প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর দায় সরকারের ওপরই পড়বে।’
আবু হানিফ শামিম বলেন, বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তা না হলে কিছু ব্যবসায়ী স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারেন।
আরেক ক্রেতা জালাল উদ্দীন রাসেল বলেন, ‘ভোক্তা পণ্যের দাম কমলে আমরা স্বস্তি পাই। সীমিত আয় দিয়ে মাসের সব খরচ চালাতে হয়। তাই নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে আমাদের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ে।’
ফেনী চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বির বলেন, বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির কারণ খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে তিনিও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা সুলতানা বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা বাজার মনিটরিং জোরদার করেছি।’
তাদের অভিযোগ, আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে সংসারের খরচ। মাছ-মাংসের মতো আমিষজাতীয় খাবার তো অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, মুদি পণ্য কিনতেও হিসাব কষতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।