কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসকের তীব্র সংকট, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ প্যাথলজি বিভাগ ও জটিল অস্ত্রোপচার—এমন নানা সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা। আধুনিক ডিজিটাল এক্সরে মেশিন থাকলেও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ও আলাদা কক্ষের অভাবে প্রায় নয় মাস ধরে সেটি বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে এলেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে কচুয়া ও আশপাশের এলাকার মানুষকে ছুটতে হচ্ছে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বাড়ছে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়, সময় ও ভোগান্তি।
সরেজমিনে দেখা যায়, গণপূর্ত বিভাগ ঘোষিত ৩১ শয্যার একটি পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, স্বাস্থ্য সহকারীদের কার্যালয়, টিকাদান কার্যক্রম, সেবিকা কক্ষসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। ভর্তি রোগীদের জন্যও ওই ভবনে চারটি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল, কোথাও কোথাও ছাদের রড বের হয়ে গেছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আতঙ্কে রয়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরাও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৫ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৪টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন চিকিৎসক। তবে নিয়মিত হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ১০ জন। ফলে ২০টি চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে।
বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো জটিল অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বর্তমানে কেবল কাটা-ছেঁড়া ও ফোঁড়ার মতো ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ। প্যাথলজিস্টের পদ থাকলেও টেকনোলজিস্ট না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
এক্সরে বিভাগেও রয়েছে অব্যবস্থাপনার চিত্র। হাসপাতালের পুরোনো এক্সরে মেশিনটি চালু থাকলেও সেটি ১৯৭২ সালের পুরোনো প্রযুক্তির। অন্যদিকে প্রায় নয় মাস ধরে হাসপাতালে পড়ে আছে আধুনিক ডিজিটাল এক্সরে মেশিন। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ও আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা না হওয়ায় সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ডিজিটাল এক্সরে মেশিনটি চালাতে প্রায় ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ পুরো হাসপাতাল বর্তমানে মাত্র ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগে চলছে। মেশিনটি স্থাপনের জন্য প্রয়োজন আলাদা কক্ষও। এসব বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬৭টি। এর বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন ছয়জন। তবে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা নাজমুল আহমেদ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। চিকিৎসক কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার অনেক সেবা এখানেও পাওয়া যায় না। ভবনের অবস্থাও খুব খারাপ। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে, আবার কোথাও বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে সবসময় ভয় কাজ করে।
তিনি বলেন, দ্রুত হাসপাতালের ভবন সংস্কার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও জনবল নিয়োগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি সব ধরনের চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন।
হাসপাতালে ভর্তি এক নারী রোগীর স্বজন মো. অয়ন বলেন, একটি ভবন পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় নারী-পুরুষ সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হচ্ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেককে বারান্দায় থাকতে হয়। নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিড়ম্বনার। বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবনের অংশ ভেঙে পড়ছে, ছাদের বিভিন্ন স্থানে রড বের হয়ে আছে। পর্যাপ্ত শয্যা, ফ্যান ও বাথরুমেরও সংকট রয়েছে।
কচুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মল্লিক নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, উপজেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু এখানে এসে অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা পাওয়া যায় না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসক সংকট ও বিভিন্ন সেবা বন্ধ থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাগেরহাট শহর কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও টাকা দুটোই বেশি খরচ হচ্ছে।
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক শেখ আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি দীর্ঘদিন সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। কিন্তু ভবনটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে বসবাস করা সম্ভব নয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে থাকতে হচ্ছে। এখনো কিছু কর্মচারী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মুশফিকুর রহমান তরফদার নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে বসেই চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। ভবনের কয়েকটি জায়গায় বড় বড় ফাটল ধরেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চিকিৎসক ও কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন ৩০০-এর বেশি রোগী হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসকের অনুমোদিত ৩৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৪ জন কর্মরত রয়েছেন। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না।
কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, হাসপাতালের পুরোনো এক্সরে মেশিন দিয়ে মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন। নতুন যে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন দেওয়া হয়েছে, সেটি চালাতে ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। অথচ পুরো হাসপাতাল চলছে মাত্র ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুতে। এ ছাড়া মেশিনটির জন্য আলাদা কক্ষও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এসব চাহিদার কথা জানিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিত্যক্ত ভবনসহ হাসপাতালের বিভিন্ন সংকটের বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।