নির্বাচনি হালচাল (সিরাজগঞ্জ-২)
যমুনা নদীর পাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জ জেলার মানুষের কাছে নদীভাঙন কোনো নতুন বিষয় নয়। প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর অমানবিক নিষ্ঠুরতায় ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
সদর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘গত ১৫ বছরে তিনবার তার বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিবার নেতারা এসে ছবি তুলে যান। ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। এবার আমরা শুধু কথা নয়, কাজ দেখতে চাই।’
একই এলাকার গৃহবধূ রাশিদা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন ভাড়া ঘরে থাকতে হচ্ছে। পুনর্বাসনের কথা সবাই বলে, কিন্তু বাস্তবে ছাড়া কিছুই দেখি না।’
নদীভাঙনের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ শহরের নিত্যদিনের নাগরিক দুর্ভোগও ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে। যানজট, দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাত, অবৈধ পার্কিং ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনায় শহরের সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শহরে আসা মানুষের দিন শুরু হয় দুর্ভোগ দিয়েই।
রিকশাচালক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘রাস্তায় নামলেই জ্যাম। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। ভোটের সময় সবাই ঠিক করার কথা বলে, পরে আর কিছুই হয় না।’
সিরাজগঞ্জ সদর ও কামারখন্দ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী,সিরাজগঞ্জ-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪ হাজার ৫০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ জন এবং নারী ২ লাখ ১ হাজার ৭৮৪ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন।
এবার এই আসনে পাঁচজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটারের সংখ্যা ও রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে সিরাজগঞ্জ-২ আসনকে ঘিরে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটি ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে চলমান রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ায় এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়েছে।
প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি মুহিবুল্লাহ এবং গণঅধিকার পরিষদের মাহফুজ রহমান নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বিএনপি প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে বলেন, নির্বাচিত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই হবে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া কাটাখালি নদী খননের মাধ্যমে বিনোদনমূলক পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম নারী ও তরুণ ভোটারদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। বেকারত্ব দূরীকরণ, নদীভাঙন রোধ ও পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী মাহফুজ রহমান বলেন, দেশের তরুণ সমাজ সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চায়। আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার শুধু আন্দোলন নয়— রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তিনি।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো আসনজুড়ে চলছে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও নির্বাচনি আলোচনা। তবে নদীভাঙন, নাগরিক দুর্ভোগ, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের প্রশ্নে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কার ওপর আস্থা রাখেন— সেটিই নির্ধারণ করবে সিরাজগঞ্জ-২ আসনের নির্বাচনি ফলাফল।
হাজারো প্রচারণার ভিড়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই— প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।