জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও রংপুর–১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গার আয়ের বড় অংশই এসেছে ‘অন্যান্য উৎস’ থেকে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তার পেশাগত আয়ের তুলনায় এই গোপন উৎসের আয় পাঁচ গুণেরও বেশি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট–১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দাখিল করা মনোনয়নপত্রের হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
হলফনামা অনুযায়ী, মসিউর রহমান রাঙ্গার পেশা দেখানো হয়েছে ব্যবসা। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫২ টাকা। অথচ ‘অন্যান্য উৎস’ (যার কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি) থেকে তার আয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকা— যা তার ব্যবসায়িক আয়ের পাঁচ গুণেরও বেশি।
এ ছাড়া কৃষি খাত থেকে তিনি আয় দেখিয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া থেকে ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং শেয়ার ও আমানত থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
রাঙ্গার পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও আয়ের বড় একটি অংশ এসেছে অস্পষ্ট অন্যান্য উৎস থেকে। তার ছেলে রাফাত রহমান জিতুর বার্ষিক আয় কৃষি থেকে ১ লাখ ১ হাজার ৬০১ টাকা এবং ব্যবসা থেকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২০০ টাকা।
পুত্রবধূ শাকিলা খানম কাকনের কৃষি থেকে আয় ৯১ হাজার ৪০০ টাকা ও ব্যবসা থেকে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬৬ টাকা। মেয়ে মালিহা তাসলিম জুঁইয়ের কৃষি থেকে আয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩০০ টাকা এবং ব্যবসা থেকে ৯৬ হাজার ৩০০ টাকা।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাঙ্গাঁর পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের ‘অন্যান্য উৎস’ থেকে আয় ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তবে এই অন্যান্য উৎসগুলোর কোনো ব্যাখ্যা বা বিবরণ দেওয়া হয়নি।
হলফনামা অনুযায়ী, মসিউর রহমান রাঙ্গার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩ টাকা। তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ১৬৮ টাকা এবং সঞ্চয়পত্রে রয়েছে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৪৮ হাজার ২৮২ টাকা।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছেলের হাতে নগদ রয়েছে ৩৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৪১ টাকা, পুত্রবধূর ৪৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৯ টাকা এবং মেয়ের হাতে রয়েছে ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ৮৯৭ টাকা। ব্যাংকে জমার ক্ষেত্রেও ছেলের রয়েছে ২০ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ টাকা, পুত্রবধূর ২৬ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৫ টাকা এবং মেয়ের ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা।
যানবাহন হিসেবে রাঙ্গা নিজের নামে দুটি কার ও একটি বাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তার ছেলের নামে রয়েছে চারটি বাস ও কার এবং মেয়ের নামে রয়েছে দুটি বাস ও কার।
স্বর্ণালঙ্কারের হিসাবে রাঙ্গা নিজের নামে ৩৮ তোলা (মূল্য ৭৬ হাজার টাকা দেখানো), ছেলের ২০ তোলা, পুত্রবধূর ২০ তোলা এবং মেয়ের নামে রয়েছে ১০ তোলা স্বর্ণ। আসবাবসহ অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য অর্জনকালীন দর অনুযায়ী ৭ কোটি ৮৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৮১ টাকা দেখানো হয়েছে, যার বর্তমান মূল্যও একই রাখা হয়েছে। নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রেও সম্পদের মূল্য অপরিবর্তিত দেখানো হয়েছে।
স্থাবর সম্পদের হিসাবে রাঙ্গার নামে রয়েছে ৫৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬১ টাকায় কেনা কৃষিজমি এবং ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৪২ হাজার ৭৫ টাকায় কেনা অকৃষিজমি।
পরিবারের নির্ভরশীল তিন সদস্যের নামে রয়েছে মোট ২ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৩০৮ টাকার কৃষি ও অকৃষিজমি। এসব জমির ক্ষেত্রেও অর্জনকালীন দরের কোনো পরিবর্তন দেখানো হয়নি।
মসিউর রহমান রাঙ্গা তিনবার রংপুর–১ আসন থেকে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি গ্রামে। তার বাবা নেছার উদ্দিন আহমেদ ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়াতেও তাদের পৈতৃক বাড়ি রয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০১৪ সালে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হন এবং একই সঙ্গে ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৬ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় পার্টির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তবে রওশন এরশাদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে দল থেকে সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ আমলে তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ আসাদুজ্জামান বাবলুর কাছে পরাজিত হন। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকার পতনের পর তিনি প্রকাশ্যে তেমন সক্রিয় ছিলেন না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে।