নির্বাচনি হালচাল (সিরাজগঞ্জ-১)
সিরাজগঞ্জ–১ আসন যমুনা নদীবেষ্টিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা, যা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিজয়ী হয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় রাজনৈতিক মাঠে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
ঐতিহ্যগতভাবে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে পরিচিত বিএনপি এবারের নির্বাচনকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসাবে দেখছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উপস্থিতিও ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কাজিপুর উপজেলা ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৪৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
যমুনা নদীবেষ্টিত সিরাজগঞ্জ–১ আসনের বেশির ভাগ মানুষই চরাঞ্চলের বাসিন্দা। নদীই তাদের জীবন, আবার নদীই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় এসব মানুষকে। ঘরবাড়ি হারানো, জমি বিলীন হওয়া আর জীবিকার অনিশ্চয়তা— এই বাস্তবতার মাঝেই তারা প্রতিবার ভোটের মুখোমুখি হন।
এ আসনের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। চরাঞ্চলের উর্বর জমিতে ধান, ভুট্টা, পেঁয়াজ ও সবজি চাষই তাদের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু উৎপাদন যতই ভালো হোক,পণ্য বাজারজাত করাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। নৌযানই চরের মানুষের একমাত্র ভরসা। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত স্রোত আর শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে নৌ চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে কৃষিপণ্য সময়মতো হাট-বাজারে পৌঁছানো যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা চরবাসীর দুঃখ-কষ্টের কথা শোনেন এবং টেকসই বাঁধ, ফেরিঘাট, পাকা ঘাট, সড়ক ও বাজার সুবিধা তৈরির আশ্বাস দেন। কিন্তু ভোট শেষ হলে এসব প্রতিশ্রুতি অনেকটাই নদীর স্রোতের মতো ভেসে যায়। তাই এবার ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিরাজগঞ্জ–১ আসনে ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে চরাঞ্চলের মানুষের মনোভাব। বন্যা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান, নৌযোগাযোগ উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম এবং বাজারজাতের সুবিধা— এই বিষয়গুলোই এবার ভোটের মাঠে প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সেলিম রেজা, জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা শাহিনুর আলম, নাগরিক ঐক্যের মনোনীত প্রার্থী সাকিব আনোয়ার এবং গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মল্লিকা খাতুন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সেলিম রেজা বলেন, ‘বর্তমানে কাজিপুরে বিএনপির নেতাকর্মীরা যেভাবে আমাদের দলকে সুসংগঠিত করেছে, তাতে আমরা আশাবাদী আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিজয় অর্জন করব। আমি নির্বাচিত হলে কাজিপুরকে একটি সুন্দর কাজিপুর গড়ার লক্ষ্যে কাজ করব। যেহেতু এটি একটি নদীভাঙন এলাকা এবং প্রতিবছর আমাদের পানির সঙ্গে লড়াই করতে হয়, তাই এসব সমস্যা দূর করাকে অগ্রাধিকার দেব।’
জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা শাহিনুর আলম বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি বিএনপি বড় দল। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কে বড়, কে ছোট দল— তা নির্ধারিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিন। আমি আশাবাদী, আমরা বিজয়ী হবো। কারণ আমরা অনেক আগের থেকেই ভোটারদের কাছে যাচ্ছি,তারা আমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন। আমার লক্ষ্য থাকবে কাজিপুরের চর অঞ্চলে একটি উপজেলা প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কৃষকরা সহজেই তাদের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্য দাম পাবেন ‘
গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘আমরা কোনো বড় দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন করছি না। এখানে ভোট দেবেন জনগণ। জনগণ যাকে চাইবে, সেটিই বড় বিষয়। এখানে প্রতীক বড় কিছু নয়, ব্যক্তিটাই সবকিছু। আমাদের দল মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে। আমি আশাবাদী, তারা আমাকে ভোট দিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেবেন। আমি নির্বাচিত হলে এই আসনে কোনো দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজ থাকবে না। শিক্ষা, রাস্তাঘাট, কৃষি ব্যবস্থা, নারীদের উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূর করতে কাজ করব।’
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগহীন সিরাজগঞ্জ–১ আসনে এবারের নির্বাচন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে ভোটারদের। চরবাসীর দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্ট, প্রত্যাশা ও প্রয়োজন যার কর্মসূচিতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিফলিত হবে, ভোটের রায়ও তার পক্ষেই যাবে। বন্যা ও নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান, নৌযোগাযোগ উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি— এসব ইস্যুতেই এবার নির্ধারিত হবে সিরাজগঞ্জ–১ আসনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।