বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিএনপি আগে কয়েকবার দেশ পরিচালনা করেছে। তখন কৃষক ঋণ মওকুফসহ আরো অনেক কাজ করেছিল বিএনপি। কিন্তু, এখন এই এলাকার মানুষের রাস্তাঘাট, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। যেহেতু, বিএনপি দেশ পরিচালনা করেছে। তাই বিএনপি জানে কিভাবে দেশ পরিচালনা করতে হয়। আজকের এই নির্বাচনী জনসভায় এসেছি আমাদের পরিকল্পনাগুলো আপনাদের মাঝে তুলে ধরার জন্য। আমাদের অনেকগুলো পরিকল্পনা রয়েছে, সবগুলো আমরা এখানে উল্লেখ করব না। সেসব পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করব যেগুলো জেলা, উপজেলা অর্থাৎ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। আমরা যদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে তাহলে আপনারাই উপকৃত হবেন, আর যদি বাস্তবায়ন না করি তাহলে আমাদের উপর কি আপনাদের আস্থা-বিশ্বাস থাকবে? থাকবে না।’
অনেক রাজনৈতিক দল বলছে, ‘বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে ধোঁকাবাজি করছে। কিন্তু, বিএনপি যখন সরকার গঠন করবে তখন আপনাদের এলাকায় যারা এমপি হবেন তারা গ্রাম থেকে প্রথমে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া শুরু করবে। আর যদি সেটা না দিই, তখন তো আপনারাই বলবেন এই যে ফ্যামিলি কার্ড দিবে বলছিল, এখন সেই ফ্যামিলি কার্ড কোথায়? আমরা ফ্যামিলি কার্ড যদি না দেই তাহলে ক্ষতি কার হবে, ক্ষতি বিএনপির হবে। এখন আপনারাই বলেন কেউ কি বুঝেশুনে নিজের ক্ষতি করতে চায়? আমরা বলতে চাই, বিএনপি দেশের মানুষকে ঠকাবে না।’
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণে সুয়াগাজীর ফুলগাজী এলাকার ‘ডিগবাজি’ মাঠে কুমিল্লা মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রায় ২৫ মিনিটের দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় বক্তব্যে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনতার উদ্দেশ্যে কিছু পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে ফ্যামিলি কার্ড দিতে চায় এদেশের খেটে খাওয়া মা-বোনদের। আমরা প্রথমে গ্রাম থেকে শুরু করবো ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে, এই দেশে যারা গৃহিনী রয়েছে তাদেরকে সারা মাসের খরচ দেব তা নয়, অন্তত একটা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় জিনিস আমরা সরকারের পক্ষ থেকে দেব। আমরা যদি কয়েকবছর ধরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করি, তাহলে আমরা আশাবাদী এ অঞ্চলের নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। নারী সমাজকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই, যাতে পরিবারের পুরুষের উপর চাপ কমে।
এসময়, কৃষকদের জন্য পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষকদের কথাও চিন্তা করেছি। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের ব্যবস্থা করব। এতে কৃষকের আর ভর্তুকি দিতে হবে না। কৃষক যদি দুইটা ফসল উৎপন্ন করে, সেখানে আমরা সেই কৃষককে অন্তত একটা ফসলের সার, বীজ, কীটনাশক আমরা বিনামূল্যে দিতে চাই। আর আমরা শুরু করবো ছোট পর্যায়ের কৃষকদের দিয়ে। ধীরে ধীরে আমরা সকল কৃষকদের এর আওতায় আনব।’
এসময়, কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি জানি এ অঞ্চলে অনেক খাল রয়েছে। আমরা কৃষি কাজের জন্য খাল খনন প্রকল্প হাতে নেব। এ অঞ্চলে আমরা সবাইকে নিয়ে খাল খনন করব।’
এরপর তারেক রহমান বেকারত্বের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তরুণদের কথাও চিন্তা করেছি। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। ইপিজেডের মধ্যে আমরা মিল-কারখানা স্থাপন করতে চাই, যেখানে কাজ করতে পারবে এ দেশের বেকার তরুণরা। এতে করে বেকারত্ব ঘুচবে৷ এছাড়া, সেখানে মেয়েদের উপযোগী কাজের ব্যবস্থাও করবো আমরা। এছাড়া, এ দেশের যারা শ্রমিক রয়েছেন তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিকে রূপান্তর করে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষা শিক্ষা দিয়ে আমরা তাদেরকে প্রবাসে পাঠাব। এতে তাদের আয় বাড়বে।’
এসময় চিকিৎসা সংকটের কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘এ অঞ্চলগুলোতে চিকিৎসাসেবার অনেক সংকট। এতে মা-বাবা, বোনেরা-ভাইয়েরা অনেক কষ্ট পেয়ে থাকে। আর এ সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা হেলথ কেয়ারার নিয়োগ করব, যাদের কাজ হবে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ছোট-খাট অসুখগুলোর চিকিৎসা দেবে। এতে করে, হাসপাতালে দৌঁড়াতে হবে না মা-বোনদের।’
তারেক রহমান আরো বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়েছি। আমি চাইলে, আমার প্রতিপক্ষ দলের সমালোচনা করতে পারি এখানে। কিন্তু, সমালোচনা করলে তো পেট ভরবে না। আমরা সমালোচনা না করে আমাদের পরিকল্পনা জানিয়েছি। আমাদের রাজনীতির মূল উৎস হচ্ছে জনগণ। তাই আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। তবে সমালোচনা তখনই করতে হবে যখন তারা বেশী ওলটপালট করবে।’
সবশেষে তারেক রহমান বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের এসব পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে। ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হলে আপনারা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোরবেলা ভোটকেন্দ্রে চলে যাবেন। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ফযরের নামাজ আদায় করবেন। তারপর কেন্দ্রের দরজা খোলা মাত্র ধানের শীষে ভোট দিবেন। কেউ যাতে ষড়যন্ত্র করে আপনাদের অধিকার নষ্ট করতে না পারে। শেষ কথা বলতে চাই, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। দেখা হবে খাল খননে।’
এদিকে, এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তারেক রহমানের কুমিল্লার সদর দক্ষিণের সুয়াগাজী ফুলতলীর ‘ডিগবাজি’ মাঠে বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি এসে সমাবেশস্থলে এসে পৌঁছান রাত সাড়ে ১০ টায়। এসেই দুই হাত উঁচিয়ে তিনি সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে বক্তব্য দেন কুমিল্লাসহ আশেপাশের জেলার বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃব্দ। এসময় দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন, কুমিল্লা-৬ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী, বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, বিএনপি'র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন, চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ আসনের প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশিদ, কুমিল্লা-৯ আসনের প্রার্থী আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. আহসানুল হক মিলন, কুমিল্লা-৭ আসনের প্রার্থী ড. রেদোয়ান আহমেদ, কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, চাঁদপুরের কচুয়া আসনের প্রার্থী জালাল উদ্দিন, ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, কুমিল্লা-৫ আসনের প্রার্থী হাজী জসিম উদ্দিন, চাঁদপুরের শাহারাস্তি আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার জাহান দোলন৷
এর আগে, সকাল থেকেই সুয়াগাজীর ফুলগাজী এলাকার সমাবেশস্থলে কুমিল্লা বিভিন্ন উপজেলাসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও নেতাকর্মীরা জড়ো হোন। ৫০ একর আয়তনের ডিগবাজি মাঠটি কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, সুয়াগাজীর জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার আগে তারেক রহমান চৌদ্দগ্রাম হাই স্কুল মাঠের একটি জনসভায়ও অংশ নেন।