শীত বিদায় নেওয়ার সময়েই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন মোড়ে হঠাৎ চোখে পড়ছে ব্যতিক্রমী ব্যানার। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ গেম অব থ্রোনস’র বহুল পরিচিত সংলাপ ‘উইন্টার ইজ কামিং’ বড় অক্ষরে লেখা এসব ব্যানারে সিরিজের চরিত্র জন স্নো’র জায়গায় দাঁড়িপাল্লা হাতে তলোয়ার ধরার ভঙ্গিতে প্রদর্শিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
পটভূমিতে তুষারপাত ও নেকড়ের ছবি থাকায় পুরো ব্যানারটি গেম অব থ্রোনস’র থিমের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যানারের নিচে লেখা রয়েছে—‘দাদু ফ্যান ক্লাব সিটিজি’।
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের চট্টগ্রাম সফর ও নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে এসব ব্যানার ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তবে ব্যানারগুলো কারা লাগিয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, ‘সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে এ ধরনের কোনো ব্যানার লাগানো হয়নি। আমাদের ব্যানারগুলো সবসময় সংগঠনের নাম দিয়েই টাঙানো হয়।’
তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কিছু নেতাকর্মী—যারা বর্তমানে সরাসরি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন—তারাই এসব ব্যানার লাগিয়েছেন। তাদের মতে, ব্যানারের ভাষা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
যদিও জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকর্মী আমিরের চট্টগ্রাম আগমনের দিন এ ধরনের ব্যানার নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন বলে জানা গেছে, তবুও ব্যানারগুলো নামানোর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
আরেকটি সূত্র জানায়, তৌসিফ ইমরোজ নামের এক যুবক ব্যানারটি প্রিন্ট করার ব্যবস্থা করেন। তবে তিনি নিজে এর ডিজাইনার নন। ব্যানারটির ডিজাইন প্রথম প্রকাশ করা হয় ‘ইলেকশন মিম পোস্টিং’ নামের একটি ফেসবুক পেজে। কেউ চাইলে তিনি ইনবক্সে ডিজাইন ফাইল সরবরাহ করছেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম নগরের বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভাস্থলেও এসব ব্যানার দেখা গেছে। সেখানে ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে ভক্ত ও সমর্থকদের ছবি তুলতেও দেখা যায়।
নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আজ কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি কক্সবাজারের মহেশখালী ও সদর, চট্টগ্রাম দক্ষিণের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া, উত্তরের সীতাকুণ্ড এবং চট্টগ্রাম নগরের বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে মোট পাঁচটি জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দাদু ফ্যান ক্লাব’ নাম দিয়ে অনুসন্ধানে একটি ফেসবুক পেজ ও একটি গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। দুটিই খোলা হয়েছে গতকাল। সেখানে এডমিন হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ নিবরাস ও তৌসিফ ইমরোজ। জানা গেছে, মোহাম্মদ নিবরাস আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের এবং তৌসিফ ইমরোজ ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
গেম অব থ্রোনস সিরিজে ‘উইন্টার ইজ কামিং’ মূলত একটি সতর্কবার্তা—কঠিন সময় ও বড় বিপদের আগমনের ইঙ্গিত। স্টার্ক পরিবারের এই উক্তি ব্যবহার করে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতীকী বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
ব্যানারটির ব্যাখ্যায় আসিফ মাহমুদ নামের একজন বলেন, ‘উইন্টার’ বলতে এখানে বিপদের আগমন বোঝানো হয়েছে—যা প্রতীকীভাবে হোয়াইট ওয়াকারদের আবির্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। নেকড়ে ছিল স্টার্ক পরিবারের প্রতীক। স্টার্করা সবসময়ই সেভেন কিংডমসের, বিশেষ করে নর্থ অঞ্চলের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসে দেখা যায়, যতবারই উইন্টার এসেছে, ততবারই কোনো না কোনো স্টার্ক সেই বিপদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এখন এক ধরনের ‘উইন্টার’ আসছে। যারা সচেতন, তারা বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন। আর সেই উইন্টার থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যও রয়েছে ‘স্টার্করা’। এ কারণেই দৃপ্ত কণ্ঠে বলা হচ্ছে—নর্থ ভুলে যায়নি। বাস্তব অর্থে এর মানে, বাংলাদেশ ভুলে যায়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনের দুঃসহ দিনগুলো দেশের মানুষ আজও বিস্মৃত হয়নি।
স্টার্ক পরিবার যখনই অপশক্তির বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছে, তখনও তারা ‘উইন্টার’-এর উপমাই ব্যবহার করেছে। রব স্টার্ক একবার বলেছিলেন, লর্ড টাইউইনকে জানিয়ে দিও— উইন্টার তার দিকেই এগিয়ে আসছে। আবার যখন অপশক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা হয়, তখনও সেই ভাষ্যই উচ্চারিত হয়। আরিয়া স্টার্ক বলেছিল, তাদের জানিয়ে দিও— নর্থ মনে রেখেছে, হাউস ফ্রের জন্য উইন্টার এসে গিয়েছিল।
এই উইন্টারের সৈনিকরা পরাজিত হলেও তারা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে—ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম নিয়ে। নেড স্টার্ক নিহত হওয়ার পর উঠে আসেন রব স্টার্ক। রব স্টার্কের মৃত্যুর পর আবার জেগে ওঠে জন স্নো ও আরিয়া স্টার্ক। সানসা স্টার্ক বলেছিলেন, তুষার পড়লে আর সাদা বাতাস বইলে একা নেকড়ে মারা যায়, কিন্তু দল টিকে থাকে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের আদর্শিক দল ধ্বংস হয়নি। বরং সেই ধারাবাহিকতা থেকেই উঠে এসেছেন নতুন নেতৃত্ব। সেই ধারার একজন আজ বলছেন— উইন্টার আসছে, এবং আমরা জানি, এর সঙ্গে কী আসছে। কারণ আমরা গ্রীষ্মের নাইট, আর উইন্টার আসছেই।