নির্বাচনী হালচাল (গাইবান্ধা-৫)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের রাজনৈতিক মাঠ। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত এই জনপদে ভোটারদের হিসাব-নিকাশে এবার বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চরাঞ্চলের ভোটাররা।
দীর্ঘদিন যাবত এই আসনে জাতীয় পার্টি ও পরবর্তী আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থীরা ৫৪ বছর পৃথকভাবে জয় করে আসলেও বর্তমানে এই আসনটি পেতে মাঠে জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। ভোটের মাঠে রয়েছে জাতীয় পার্টি সতন্ত্র প্রার্থীরাও । এক সময়ের রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টির দুর্গ নামে পরিচিত থাকলেও পরে আওয়ামী লীগের ডিপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া দীর্ঘদিন এই আসনে জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েও এলাকার মানুষের কোনো উপকারে না আসতে পারলেও তার দলের নেতাকর্মীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। তাই এই আসনের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সংসদীয় আসনের এমপি প্রার্থী যারা ভোটে দাঁড়িয়েছেন। ভোটাররা সৎ, নির্ভীক মনোভাব পোষণের মাধ্যমে নদীভাঙা চরের জনগণের উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি একজন মানুষকে এবার ভোট দিবেন।।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি হতে যাচ্ছেন চরের লাখো ভোটার। তবে নির্বাচনী উত্তাপের মাঝেও এই জনপদে ‘গণভোট’ সংক্রান্ত কোনো প্রচারণার উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় থাকলেও এলাকায় গণভোট বা আনুষঙ্গিক অন্য কোনো সাংবিধানিক প্রচারণার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। ভোটারদের মনোযোগ এখন কেবল প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নকে ঘিরে। হাটে-ঘাটে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রার্থীদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চললেও গণভোটের বিষয়টি সাধারণ মানুষের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না।
সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে এই আসনটি গঠিত। দুই উপজেলার মোট ১৭টি ইউনিয়নের বড় একটি অংশ নদীবর্তী ও চরাঞ্চলে অবস্থিত। যমুনার করাল গ্রাসে বারবার ভিটেমাটি হারানো এই মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন বঞ্চিত। তবে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এই অঞ্চলটি।
ফুলছড়ির সাতটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এবং সাঘাটার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে সাঘাটা ও হলদিয়া ইউনিয়নে বিশাল সংখ্যক ভোটার চরাঞ্চলে বাস করেন। মূল ভূখণ্ডের ভোট রাজনৈতিক মেরুকরণে ভাগ হয়ে থাকলেও, চরের ভোট সাধারণত একমুখী হওয়ার প্রবণতা থাকে, যা যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে নিঃশব্দ এক ‘কৃষি বিপ্লব’ ঘটেছে। অর্ধশতাধিক চর থেকে বছরে প্রায় ২ লাখ টনেরও বেশি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যা জেলার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুতের অভাব এবং নদী ভাঙনের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মনে।
দীর্ঘকাল উন্নয়নবঞ্চিত এই ভোটাররা এবার প্রার্থীদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। প্রার্থীরা এখন কেবল মাইকিং নয়, বরং দীর্ঘ পথ নৌকায় পাড়ি দিয়ে এবং বালুচরে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে— নদী ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ, ব্রিজ-কালভার্ট, নির্মাণ ও জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে জমি রক্ষা, বিদ্যুৎ ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা, চরের অভ্যন্তরে সাব-রাস্তা নির্মাণ, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও স্কুলগুলোতে শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
চরের সাধারণ ভোটাররা এবার অনেক বেশি সচেতন। সাঘাটার দিঘলকান্দির চরের এক প্রবীণ ভোটার বলেন, ‘ভোটের সময় সবাই আইসা বড় বড় কথা কয়। কিন্তু বন্যা আর ভাঙনের সময় কাউরে পাওন যায় না বাজান। এবার আমরা দেইখা-শুইনা ভোট দিমু যে আমাগো বিপদে পাশে থাকবো।’
তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রথমবার ভোট দেওয়ার উচ্ছ্বাস থাকলেও কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা চান তারা। তাদের মতে, চরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কেবল আশ্বাস নয়,টেকসই উন্নয়ন প্রয়োজন।
চরাঞ্চলগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নির্বাচনী তদারকি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রশাসনের জন্য বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ। তবে জেলা নির্বাচন অফিস ও স্থানীয় প্রশাসন সকল দুর্গম কেন্দ্রেই অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে।
আসনটিতে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ফারুক আলম সরকার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আব্দুল ওয়ারেছ, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) কাঁচি প্রতীকে রাহেলা খাতুন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকে শ্রী নির্মল, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাঁস প্রতীকে নাহিদুজ্জামান নিশাদ, মোটরসাইকেল প্রতীকে এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু ও ঘোড়া প্রতীকে হাসান মেহেদী বিদ্যুৎ।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী,আসনের মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩,৮৫,২৬১ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৯২,২৭৭ জন ও নারী ভোটার ১,৯২,৯৮১ জন এবং হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) ভোটার রয়েছেন ৩ জন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি মোট ১৪৬ টি ভোটকেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচনের দিনই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।