চারদিকে সুউচ্চ ভবন, সিসিটিভি ক্যামেরা আর হাজারো মানুষের কোলাহল। আপাতদৃষ্টিতে দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বাণিজ্যিক এলাকা মনে হলেও, অপরাধীদের কাছে রাজধানীর মতিঝিল যেন এখন এক অভয়ারণ্য। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একই এলাকায়, একই সময়ে এবং প্রায় একই কায়দায় প্রকাশ্য দিবালোকে দুটি বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা পুরো ঢাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। রোববারের (৭ জুন) চাঞ্চল্যকর গুলি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন মনে হলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—এর ঠিক দুমাস আগেও একই স্পটে ঘটেছিল আরেক দুর্ধর্ষ ছিনতাই! অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢিলেঢালা তদন্তের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা আবারও রাজপথ রক্তাক্ত করার সাহস পেল!
অতীতের তথ্য বলছে, মতিঝিলে অপরাধের এই ভয়ংকর কার্যক্রম নতুন নয়। গত ৯ এপ্রিল বিকেল ৩টা ১০ মিনিটের ঘটনা। মতিঝিলের আমিন কোর্ট শাখা থেকে দুই লাখ টাকা উত্তোলন করে রিকশাযোগে দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন ব্যাংকার মামুনুর রশিদ। বাসা ভাড়া দেওয়ার পর তার পকেটে অবশিষ্ট ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা। জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আসামাত্রই পেছন থেকে দ্রুতগতিতে এসে তার রিকশার গতিরোধ করে দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি। প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে চোখের পলকে তার পকেটের সব টাকা ছিনিয়ে নিয়ে সিটি সেন্টারের পাশ দিয়ে আরামবাগের দিকে চম্পট দেয় তারা।
ভুক্তভোগী মামুনুর রশিদের স্ত্রী বিনীতা হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছে যে তার স্বামী চিৎকার করারও সুযোগ পাননি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ঘটা এই ছিনতাইয়ের পর মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করতে ভুক্তভোগীকে টানা ১ মাস ঘুরতে হয়েছে!
প্রথম ঘটনার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বা কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার চড়া মূল্য দিতে হলো ঠিক দুই মাসের ব্যবধানে। রোববার আবারও সেই বিকেল ৩টা ১০ থেকে সোয়া ৩টার ‘ডেঞ্জার জোন’! এবার আর শুধু ভয় দেখানো নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে চলল গুলি। এবারের টার্গেট ছিলেন লোকমান হোসেন নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। কোনো নির্দিষ্ট অফিস না থাকায় তিনি মতিঝিল এলাকায় ঘুরে ঘুরে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন। আর তার এই গতিবিধির ওপর আগে থেকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল একটি পেশাদার চক্র।
এদিন বিকেলে নটরডেম কলেজ সংলগ্ন সড়ক দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে যাচ্ছিলেন লোকমান। পথে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আসামাত্রই তিনটি মোটরসাইকেলে করে ধেয়ে আসে হেলমেট পরিহিত ৬ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। লোকমানকে লক্ষ্য করে তারা সরাসরি গুলি চালায়! গুলির বিকট শব্দে ব্যস্ত মতিঝিল মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়াবহতায়। লোকমান হোসেনের শরীরে তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়—দুটি পায়ে এবং একটি হাতে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ামাত্রই তার হাতের টাকার ব্যাগটি লুটে নিয়ে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যায় মোটরসাইকেল আরোহী সেই ছয় ব্যক্তি। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছিনতাই হওয়া সেই ব্যাগে প্রায় ১৭ হাজার মার্কিন ডলারসহ বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ছিল বলে ভুক্তভোগী দাবি করেছেন। তবে ব্যাগে মোট কত টাকার সমপরিমাণ অর্থ ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ধারণা, ভুক্তভোগী—লোকমান হোসেনকে অনেক আগে থেকেই অনুসরণ ও রেকি করা হয়েছিল। তিনি যে সেই মুহূর্তে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বহন করছিলেন, সেই নিশ্চিত তথ্য পেয়েই ছিনতাইকারীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এই হামলা চালিয়েছে।
কিন্তু যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে—৯ এপ্রিল জনতা ব্যাংকের সামনে ব্যাংকার মামুনুর রশিদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, ঠিক দুই মাসের ব্যবধানে সোনালী ব্যাংকের সামনে ব্যবসায়ী লোকমানের সঙ্গেও হুবহু একই কায়দায় হামলা চালানো হলো। দিনের আলোয় রাজধানীর এমন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একের পর এক পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ ছিনতাই কীভাবে সম্ভব? প্রথম ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন তৎপর হলে এবং মামলা নিতে ১ মাস সময় না কাটালে হয়তো গতকালের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করা হচ্ছে। এই দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী চক্রের পেছনের কুশিলবদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করাই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি।