ছদ্মবেশী বিআইডব্লিউটিএ’র আরিফ!
নদী বাঁচানোর শপথ নিয়ে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন এ কে এম আরিফ উদ্দিন। অথচ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ আর শীতলক্ষ্যা নদীকে বানিয়েছেন নিজের টাকা কামানোর মেশিন! যদিও নারী কেলেঙ্কারিতে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক, কীভাবে দুই স্ত্রীর নামে গড়ে উঠেছে সম্পদের পাহাড়- তা নিয়ে 'নাগরিক প্রতিদিন'-এর বিশেষ অনুসন্ধান।
আরিফ উদ্দিনের সম্পদের হিসাব রূপকথার আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়। দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়া একাধিক অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, তার অবিশ্বাস্য সব সম্পদের বিবরণ: বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্লক-সি-এর ২/এ রোডের ৪৭/৫৫ নম্বর বাড়িতে ৩ হাজার ৬০০ স্কয়ার ফিটের আলিশান ফ্ল্যাটে তিনি নিজে পরিবারসহ বসবাস করছেন। এছাড়া বসুন্ধরার বি-ব্লক (হোল্ডিং ৪১, ৪৭, ৪৮, ৫২) ও সি-ব্লকে তার ও স্ত্রীর নামে রয়েছে আরও একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বিল্ডিং। মোহাম্মদপুরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের সি-ব্লকে (রোড-৪, বাড়ি-৩৭) স্ত্রীর নামে রয়েছে বিলাসবহুল ৫ তলা ভবন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। এছাড়া এলিফ্যান্ট রোডে স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় ২২ কোটি টাকা মূল্যের ৩০1 নম্বর ৫ তলা কমার্শিয়াল বিল্ডিং। নিজ জেলা পাবনার সুজানগর ও সদরের বনখোলা, ঘেতুপাড়া, রামপুর, হাটখালি এলাকায় কিনেছেন প্রায় ২০০ বিঘা জমি। পাবনা সদরের স্কয়ার রোড, কাচারী পাড়া ও সাধুপাড়ায় রয়েছে যথাক্রমে ৬ তলা, ৫ তলা ও ৪ তলা বিশিষ্ট তিনটি আলিশান বাড়ি।
বিদেশে অর্থ পাচার ও বিলাসী জীবন: আরিফ উদ্দিনের স্ত্রী শামীমা দীবা, ছেলে সাদ ও মেয়ে আরিন সবাই দেশের বাইরে থাকেন। ছেলে আমেরিকায় ও মেয়ে লন্ডনে পড়াশোনা করে, যার পেছনে বছরে খরচ হয় কোটি টাকা। এছাড়া ব্রিটেনে বাড়ি কেনা ও বিপুল অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তিনি যেখানে অফিস করেন, সেখানে নিজের বসার জন্য তিনটি রুম প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ করে এসি ও ডেকোরেশন করিয়েছেন, যদিও সেখানে তিনি নিজে বসেন না বললেই চলে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের 'স্থাপনা উচ্ছেদের' ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আরিফ। মোটা অঙ্কের টাকা পেলে অবৈধ ডকইয়ার্ড বা স্থাপনা উচ্ছেদ না করে পার করে দিতেন, আর চাঁদা না দিলে নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিতেন বৈধ স্থাপনা।
ঢাকা নদীবন্দর কর্মকর্তা থাকাকালীন লালবাগের পূর্ব ইসলামবাগ এলাকায় চাঁদা না পেয়ে প্রায় ১৮টি বৈধ ভবন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভেঙে ফেলেন তিনি। ভবনগুলো ভাঙার আগে বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি এবং বাসিন্দাদের নামার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি, যাতে আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ।
২০১৮ সালের ৫ আগস্ট সদরঘাটে বায়তুল নাজাত মসজিদ ও মাদরাসার দুটি দোকান এবং মাসে ৪০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে সেটি ভাঙতে যান আরিফ। এতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৫ জন আহত হন। পরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরের দিন মন্ত্রীর নির্দেশে মসজিদটি সংস্কার করা হয়।
সদরঘাট থেকে পিকনিকে যাওয়ার সময় তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে একটি লঞ্চের মাস্টারকে মারধর করেন আরিফ। সে সময় লঞ্চে উপস্থিত থাকা আর্মি অফিসার ও সচিবকেও লাঞ্ছিত করেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় পার পেয়ে যান।
আওয়ামী লীগ আমলে আরিফ উদ্দিন ছিলেন কট্টর আওয়ামীলীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী। দাপট দেখাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তোলা ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে বেড়াতেন। শেখ হাসিনার জন্মদিনে তুরাগ নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন করে একদিকে সরকারি তহবিলের কোটি টাকা কামিয়েছেন, অন্যদিকে স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে এক কোটি টাকা চাঁদা তুলেছেন। তৎকালীন দুই মন্ত্রীর কারণে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হওয়া সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে ছিলেন তিনি। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের সাথে সাথেই রাতারাতি ভোল পাল্টেছেন আরিফ উদ্দিন। নিজেকে এখন একটি বিশেষ দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি দাবি করছেন।
ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন তার নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে । তার ব্যাংক হিসাব, ব্যক্তিগত নথি ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা শেয়ারের নথিপত্র তলব করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে জাকির হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের নতুন অভিযোগ দাখিল করেছেন দুদকে।
এতসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আরিফ উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপেও তাকে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর সঙ্গে অশ্লীল ভিডিও ক্লিপ প্রকাশের ঘটনায় এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে (আরিফ হাসনাত) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগসহ সকল মাধ্যমে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।