আফতাবনগরে সিটিটিসির অভিযান
উন্নত জীবনের হাতছানি, রমরমা বেতনের চাকরি আর এক বুক স্বপ্ন—এই সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করেই জাল বিছিয়েছিল এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র। শত শত তরুণকে কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে নরককুণ্ডে ঠেলে দেওয়া এই চক্রের মূল হোতা অবশেষে ধরা পড়েছে আইনের জালে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেল পৌনে ৬টা। রাজধানীর বনশ্রী-সংলগ্ন আফতাবনগর এলাকা তখন প্রতিদিনের মতোই জনাকীর্ণ। ঠিক তখনই সেখানে অবস্থান নেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের একটি বিশেষ চৌকস দল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিখুঁত ফাঁদ পেতেছিল তারা। মুহূর্তের অভিযানে আফতাবনগরের বুক থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কম্বোডিয়া পাচার চক্রের মোস্ট ওয়ান্টেড মাস্টারমাইন্ডকে।
তার নাম— মোঃ মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকী (৪০)। বাইরে একজন সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে থাকলেও, ভেতরে সে ছিল এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক অপরাধের ব্লুপ্রিন্ট রচয়িতা।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকী স্রেফ কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। সে ঢাকা বিমানবন্দর থানায় দায়েরকৃত 'মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ'-এর একটি স্পর্শকাতর মামলার এজাহারনামীয় প্রধান পলাতক আসামি। দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আড়ালে থেকে নিজের নেটওয়ার্ক চালাচ্ছিল সে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় যে মানব পাচার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম মূল হোতা এই মাহাফুজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন আইটি ফার্ম বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চ বেতনের চাকরির ভুয়া অফার দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণ-তরুণীদের সংগ্রহ করত। এরপর স্টুডেন্ট ভিসা বা ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে তাদের কম্বোডিয়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বদলে যেত পুরো দৃশ্যপট। ভিসা ও পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে এই তরুণদের আটকে রাখা হতো সুরক্ষিত সাইবার স্ক্যামিং ক্যাম্পে। সেখানে তাদের বাধ্য করা হতো আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি, অনলাইন জুয়া এবং ডেটিং স্ক্যামের মতো ভয়ংকর সব সাইবার অপরাধ করতে। কেউ কথা না শুনলে বা দেশে ফিরে আসতে চাইলে চলত অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মুক্তিপণ হিসেবে ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হতো লাখ লাখ টাকা। আর এই পুরো আন্তর্জাতিক চক্রের বাংলাদেশী সংযোগের কলকাঠি নাড়ত এই মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকী।
আফতাবনগরের এই সফল অভিযানের পর স্বস্তি ফিরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে। সিটিটিসি জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, মাহাফুজকে রিমান্ডে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য প্রভাবশালী সদস্য, ট্রাভেল এজেন্সি এবং কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত আন্তর্জাতিক চক্রের মূল হোতাদের নাম ও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসবে।