ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মহিউদ্দীন খন্দকার মিজানকে ঘিরে অবৈধ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে তার মা দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ অসদাচরণের অভিযোগে চলতি বছরের ২ জুলাই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ১ জুলাই অধিদপ্তরের বারাক ভবনের চতুর্থ তলার একটি অতিথি কক্ষে সিলেট বিভাগের ১৫টি ফায়ার স্টেশনের পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছিল। এ সময় এক নারী ও সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া চালক সাখাওয়াত হোসেনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় মহিউদ্দীনও জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে সেখানে মারামারির ঘটনা ঘটে।
দুদকে অভিযোগ
২০২৬ সালের ১১ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা অভিযোগপত্রে মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মহিউদ্দীন নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার ফায়ার ফাইটার ও চালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে এই মহিউদ্দিনের হাত ধরে। বিশেষ করে বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার ফাইটার ও চালক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সেসময়ে সর্বমোট ৩ হাজার ৫০০ জন নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মহিউদ্দীন অন্যতম পরিকল্পনাকারী বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের বদলি শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিকে কেন্দ্র করেও আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর দেওয়া একটি অভিযোগপত্রে মহিউদ্দীন ও তার কথিত সিন্ডিকেটের বিষয়ে একই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের জোড়ালো দাবি, ফায়ার সার্ভিসের গত কয়েক বছরের নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেন, মহিউদ্দীনের সম্পদ বিবরণী এবং তার বিরুদ্ধে করা মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হয়েও অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে ঢাকার উত্তরায় প্রায় তিন কাঠা জমি, কয়েকটি ট্রাক এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব ঘটনা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হোক।
মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা
এদিকে, ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় মহিউদ্দীনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ২০২২ সালের ২৪ মার্চ ওই বিরোধের জের ধরে দুলালী বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, দিবাগত রাত ১টার দিকে দুলালী বেগমের ছোট ছেলে মমিন খন্দকার মায়ের মৃত্যুর খবর পান। ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃত্যু অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় লাশ উত্তোলন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের আবেদনও করা হয়।
মহাপরিচালকের বক্তব্য
এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ১ জুলাইয়ের ওই ঘটনার সঙ্গে মহিউদ্দীনের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নজরে আসার পরপরই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মহাপরিচালক আরও বলেন, মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের তদন্তও বর্তমানে চলমান রয়েছে। তদন্তে আনীত অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মহিউদ্দীন খন্দকারের সঙ্গে নাগরিক প্রতিদিনের পক্ষ থেকে কয়েকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি রিসিভ না করলেও পরে কলটি গ্রহণ করেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে উগ্র আচরণ করেন। পরবর্তী সময়ে জানান, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আগে প্রমাণ করুন, তারপর আমি মন্তব্য করব। আমি এখন হসপিটালে আছি।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।