অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করে বলেছেন, কঠোর বাজেট ব্যবস্থাপনার সময় এলেও সরকার এখনো সেই বাস্তবতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। তিনি বলেন, দেশের আসন্ন জাতীয় বাজেট এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রণয়ন করা হচ্ছে, যখন অর্থনীতি গভীর কাঠামোগত ও নীতিগত সংকটে রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় বাজেট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ঢাকায় সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশের আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা ফিসকাল স্পেস বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে, ফলে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী না আসায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে আরও প্রকট করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নতুন সরকার বর্তমানে একটি ‘হার্ড বাজেট কনস্ট্রেইন্ট’-এর মধ্যে কাজ করছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, অসম্পূর্ণ নীতিগত সংস্কার এবং ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি। সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার সংকট এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে তিনি অর্থনীতির প্রধান চাপের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন।
চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে ‘ট্রিপল থ্রেট’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, জ্বালানির উচ্চ ব্যয় একদিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়াবে, অন্যদিকে ভর্তুকির চাপ বাড়াবে এবং টাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে রাজস্ব সুরক্ষা ও ভোক্তাদের ব্যয় সহনীয় রাখা—এই দুয়ের মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ড. ভট্টাচার্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না, যা কর ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এ অবস্থায় তিনি ধাপে ধাপে কর ছাড় প্রত্যাহার, করজাল সম্প্রসারণে কঠোর তদারকি এবং সম্পত্তি করসহ নতুন কর ক্ষেত্র চালুর প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের মুনাফা রাজস্ব হিসেবে ব্যবহার, লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারবাজারে ছাড় এবং পাচার হওয়া অর্থ ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ভর্তুকি যৌক্তিক করা, রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং সরকারি বেতন-পেনশন ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে টেকসই ঘাটতি অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মাধ্যমে বেইলআট নির্ভরতা কমানোর সুপারিশ করেন।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ও বারবার সময় বাড়ানো প্রকল্পগুলো ছাঁটাই করতে হবে। এসব প্রকল্পকে তিনি ‘জম্বি প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেন। উন্নয়ন ব্যয় পর্যালোচনায় স্বল্পমেয়াদি একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
ড. ভট্টাচার্য ‘ফিসকাল সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কর প্রদান ও জনসেবার মধ্যে দৃশ্যমান সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে তিনি চলতি অর্থবছরের অবশিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর বাজেট সীমা আরোপ, দ্রুত রাজস্ব সংস্কার বাস্তবায়ন এবং এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এডিপি পর্যালোচনায় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি তিন বছর মেয়াদি বাজেট কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বৈদেশিক ঋণকে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল বা স্থগিতের বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি।
ড. ভট্টাচার্য প্রস্তাব করেন, এপ্রিলের শুরুতেই অর্থমন্ত্রীকে সংসদে একটি অর্থনৈতিক বিবৃতি উপস্থাপন করা উচিত, যেখানে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও উত্তরণের পথ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে। তার মতে, এটি হবে সরকারের স্বচ্ছতার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
প্রশ্নোত্তর পর্বে বলা হয়, ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে হলে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ এবং প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৬ শতাংশে ধরে রাখতে হবে।
এ ছাড়া কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, নীতি প্রণয়ন ও কর আদায় কার্যক্রম আলাদা করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।