নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দুর্বল ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর আগের মালিকদের আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ দিয়ে সরকার মূলত চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের পথ খুলে দিয়েছে। এতে ব্যাংক খাত আবারও দুর্নীতি ও লুটপাটের ঝুঁকিতে পড়বে, যা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে তারা।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দেওয়া এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন আইনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বদলে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই বজায় রাখা হয়েছে। আগে জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ দায়ীদের মালিকানায় ফেরার সুযোগ না থাকলেও, নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় সেই বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার যে যুক্তিই দিক না কেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আইনি জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে। এতে তাদের শাস্তি না হয়ে বরং পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
টিআইবির প্রশ্ন, যেসব মালিক ব্যাংক খাতের সংকটের জন্য দায়ী, তারা কীভাবে আবারও একই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে? নতুন আইনে বলা হয়েছে, তারা নির্ধারিত অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়ে বাকি টাকা দুই বছরে ১০ শতাংশ সুদে পরিশোধ করতে পারবে। একই সঙ্গে তাদের ওপর নতুন মূলধন যোগান, আমানতকারীদের টাকা ফেরত, কর পরিশোধসহ নানা শর্তও রাখা হয়েছে।
তবে টিআইবির মতে, এসব শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, যদি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে সরাসরি মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে না। বরং এতে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি আরও বাড়তে পারে এবং এর বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হবে।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরোনো শেয়ার হোল্ডাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হলে, এ খাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সরকার ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নামে দুর্নীতি সহায়ক নতুন বিধান যুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠার জোরে যে আইনটি সংসদে পাস করেছে, তা কী আদৌ ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছে, তা প্রতিপালনে সহায়ক হবে! না-কী সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষায় এ জাতীয় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে! এ ব্যাপারে সরকারকে পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।’
উল্লেখ্য, গত ১০ এপ্রিল, জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক রেজুলেশন বিল ২০২৬ সংসদে উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই বিলটি পাস করা হয়েছে।
তবে নতুন সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রমের বিপরীতমুখী অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে নতুন সংযোজিত ১৮(ক) ধারা ঘিরেই এই বিতর্কের মূলকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিবর্তনকে অর্থনীতির বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি “নতুন সুযোগের জানালা” হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন— এটি ব্যাংক খাতে জবাবদিহির ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।