বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে যখন কালবৈশাখীর মৌসুমে প্রচণ্ড দাবদাহের পর এক চিলতে বৃষ্টির আভাস মেলে, তখনই শুরু হয় বজ্রপাতের তাণ্ডব। ২৭ ও ২৮ এপ্রিল সারাদেশে ডজনেরও বেশি মানুষ বজ্রাঘাতে নিহত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক যুগে বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি মানুষ এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বজ্রাঘাতে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ দুটি—বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রামীণ বনাঞ্চল উজাড়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১২ শতাংশ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হিমালয় থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম বাতাসের মিলনস্থলে অবস্থিত, যা এখানে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে আগে গ্রামাঞ্চলে যে বড় বড় গাছ, যেমন তাল, বট বা শিমুল ছিল, সেগুলো কেটে ফেলায় এখন খোলা মাঠে থাকা মানুষই হয়ে উঠছে বজ্রবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু।
বিশেষ করে হাওর এলাকায় উঁচু কোনো বৃক্ষ বা স্থাপনা না থাকায় বজ্রপাতের এক কিলোমিটারের মধ্যে মানুষই হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ পরিবাহী সবচেয়ে উঁচু মাধ্যম। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন আর প্রকৃতি বিনাশের দ্বিমুখী সংকটে বাংলাদেশ এখন বজ্রপাতের মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
বজ্রাঘাতে মৃত্যু কি সত্যিই ঠেকানো সম্ভব
বজ্রাঘাতে মৃত্যু ঠেকানো অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা। অতীতে সরকার সারাদেশে ৩৮ লাখ তালগাছের চারা রোপণের যে উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল, তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ বড় হয়ে বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করতে ২০ থেকে ৩০ বছর সময় নেয়, কিন্তু বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সমাধান।
এখন সময় এসেছে উন্নত বিশ্বের মতো আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ও লাইটনিং শেল্টার বা বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের। ফসলি মাঠ বা হাওর এলাকায় যেখানে কৃষকরা কাজ করেন, সেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বজ্রনিরোধক দণ্ড সংবলিত টাওয়ার স্থাপন করা জরুরি। এ ছাড়া লাইটনিং অ্যারেস্টর বা এয়ার টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে বজ্রবিদ্যুৎকে নিরাপদে মাটিতে নামিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।
আগের সরকারের পক্ষ থেকে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যার সফল বাস্তবায়ন হলে বজ্রপাতপ্রবণ জেলাগুলোতে প্রাণহানি কমবে। তবে অবকাঠামোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাও অপরিহার্য; যেমন আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই খোলা মাঠ ছেড়ে কোনো পাকা দালানে আশ্রয় নেওয়া এবং ভুল করেও বিদ্যুৎ পরিবাহী কোনো গাছের নিচে না দাঁড়ানোই হতে পারে জীবন রক্ষার সহজ উপায়।
বজ্রাঘাতে মানুষের মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়
বজ্রপাত কীভাবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, সেই প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত জটিল ও দ্রুততম একটি প্রক্রিয়া। বজ্রবিদ্যুতের ধর্মই হচ্ছে মাটিতে আঘাত করার আগে সে সবচেয়ে কাছে থাকা উঁচু জায়গাটিকে খুঁজে নেয়। খোলা মাঠে যখন কোনো কৃষক কাজ করেন বা কেউ যাতায়াত করেন, তখন মাটির চেয়ে মানুষের শরীর কিছুটা উঁচুতে থাকায় বিদ্যুৎপ্রবাহ সেই শরীরকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।
মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ মূলত কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। বজ্রপাতের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎশক্তি যখন মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তা স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ হার্ট অ্যাটাক ঘটায়।
এ ছাড়া সরাসরি মাথায় বা শরীরে আঘাত ছাড়াও মাটির মাধ্যমে প্রবাহিত বিদ্যুতেও মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বজ্রপাত কোনো গাছের ওপর পড়লে সেই গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিও আক্রান্ত হন, কারণ গাছ বিদ্যুৎ পরিবাহী।
আবার কোনো পুকুর বা জলাশয়ে বজ্রপাত হলে তার আশপাশে থাকা মানুষের শরীরেও শক লাগতে পারে। মূলত কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ এবং লাখ লাখ ভোল্ট মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পুড়িয়ে দেয় বা অকেজো করে ফেলে, যা থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা থাকে অত্যন্ত ক্ষীণ। এই বিদ্যুৎপ্রবাহ মানুষের শরীরের টিস্যু পুড়িয়ে দেয় এবং মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে মুহূর্তেই নিথর করে দেয় প্রাণ চঞ্চল দেহটিকে।