২২ এপ্রিল, জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের জন্মদিন। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের ইতিহাসে তার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তবে তা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে। তিনি যেমন ছিলেন একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, তেমনি ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী অস্ত্রের, পরমাণু বোমার অন্যতম প্রধান কারিগর। তার জীবন এবং কাজ আজও আমাদের মনে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে: তিনি কি মানব সভ্যতাকে যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচানো এক মহানায়ক, নাকি কোটি প্রাণের সংহারক এক খলনায়ক?
১৯০৪ সালে নিউইয়র্কের এক স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়া ওপেনহাইমার ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে তার মন চলে যায় পদার্থবিজ্ঞানের দিকে। ইউরোপে গিয়ে তিনি ক্যামব্রিজ এবং পরে জার্মানির গটিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সময় গটিংজেন ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে ম্যাক্স বর্ন, হাইজেনবার্গ, পাউলির মতো কিংবদন্তি বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্যে এসে ওপেনহাইমার নিজেকে একজন দক্ষ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে তোলেন। ব্ল্যাক হোল এবং নিউট্রন স্টারের ওপরে তার গবেষণা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, যখন খবর পাওয়া গেল যে নাৎসি জার্মানি পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করছে, তখন আমেরিকার সরকারও সজাগ হয়ে ওঠে। শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’। আর এই প্রজেক্টের বৈজ্ঞানিক পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের ওপর। নিউ মেক্সিকোর লস আলামাস ল্যাবরেটরিতে বিশ্বসেরা সব বিজ্ঞানীদের নিয়ে ওপেনহাইমার শুরু করেন এক গোপন মিশন। তার নেতৃত্বেই তৈরি হয় পৃথিবীর প্রথম তিনটি পারমাণবিক বোমা—‘ট্রিনিটি’ টেস্টের জন্য তৈরি করা বোমা, হিরোশিমার ‘লিটল বয়’ এবং নাগাসাকির ‘ফ্যাট ম্যান’।
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই, নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ট্রিনিটি টেস্টের মাধ্যমে সফলভাবে বিস্ফোরিত হয় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা। সেই মুহূর্তের ভয়াবহ উজ্জ্বল আলো এবং বিধ্বংসী রূপ দেখে ওপেনহাইমারের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল সেই কালজয়ী শ্লোক—‘এখন আমিই মৃত্যু, জগতের ধ্বংসকারী’।
সেই মুহূর্তে তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি এমন এক দানব তৈরি করেছেন যা মানব সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই আবিষ্কার তার জীবনে এক স্থায়ী অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছিল।
হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণের পর জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এই দিক দিয়ে বিচার করলে অনেকেই ওপেনহাইমারকে একজন ‘নায়ক’ হিসেবে দেখেন, কারণ তার আবিষ্কার যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করে অনেক সৈন্যের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে, মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ নিরীহ মানুষের মৃত্যু তাকে ‘খলনায়ক’ হিসেবেও প্রতিপন্ন করে। ওপেনহাইমার নিজেই এই দোলাচলে ছিলেন। তিনি পরবর্তীতে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসারের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং হাইড্রোজেন বোমার উন্নয়নে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
বিজ্ঞানের শক্তিকে যুদ্ধের ভয়াবহ কাজে ব্যবহার করার পর ওপেনহাইমার বাকি জীবন কাটিয়েছিলেন এক গভীর অপরাধবোধ নিয়ে। ১৯৫২ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নও সফলভাবে পরমাণু বোমার পরীক্ষা সম্পন্ন করে, তখন বিশ্বের মানুষ বুঝতে পারে যে এক ভয়াবহ ‘কোল্ড ওয়ার’ বা স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। ওপেনহাইমার তখন লিখেছিলেন, ‘আমরা এখন এক বিপজ্জনক জগতে বাস করছি’।
জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের জীবন আমাদের এই সত্য মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যখন মানুষের সেবার বদলে ক্ষমতার হাতিয়ার হয়, তখন তা ধ্বংস আনে। আজ তার জন্মদিনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন সেই বিজ্ঞানেরই জয়গান গাই, যা আমাদের জীবনকে উন্নত করে, ধ্বংস নয়।