ক্যামেরার ফ্রেম যখন ইতিহাসের দলিল হয়ে ওঠে, তখন আলোকচিত্রী কেবল একজন শিল্পী থাকেন না, হয়ে ওঠেন দ্রষ্টা। ১৯৭১ সালে যখন এই ভূখণ্ডে একটি নতুন মানচিত্রের জন্ম হচ্ছিল, তখন সেই প্রসববেদনার ছবিগুলো বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে কজন মানুষ, রঘু রাই তাদের অগ্রগণ্য।
রোববার (২৬ এপ্রিল) ৮৩ বছর বয়সে ভারতের নয়াদিল্লিতে এই আলোকচিত্রী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল এক পরম সুহৃদকে।
১৯৭১ সালে রঘু রাই যখন সীমান্ত এলাকায় পা রাখেন, তখন তার সামনে ছিল লাখে লাখে মানুষের স্রোত। কেবল সাংবাদিকতা নয়, মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি ফ্রেমবন্দি করেছিলেন শরণার্থী শিবিরের সেই অবর্ণনীয় দুর্দশা। তার তোলা ছবিতে ধরা পড়েছিল অনাহারী শিশুর করুণ চাহনি, ক্লান্ত বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস আর মেঘলা আকাশতলে কাদা-মাখা পথে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলা অন্তহীন মানুষের সারি।
যশোর রোডের ধুলোবালি থেকে শুরু করে যুদ্ধের বিভীষিকা, তার প্রতিটি ছবি ছিল যেন একেকটি হাহাকার। সেই ছবিগুলো যখন বিশ্বের নামী সব সংবাদপত্রে ছাপা হলো, তখন বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের আত্মত্যাগের গভীরতা। রঘু রাই বলেছিলেন, ‘আমি কেবল ছবি তুলিনি, আমি বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামকে নিজের অস্তিত্বে অনুভব করেছি।’
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতের ঝিলমে (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্ম নেওয়া রঘু রাই পেশাজীবন শুরু করেছিলেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার মাধ্যমে। পরে তিনি বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘ইন্ডিয়া টুডে’-তে কাজ করেন। কিংবদন্তি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁর জহুরি চোখ তার প্রতিভা চিনতে ভুল করেনি। তার আমন্ত্রণে ১৯৭৭ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এর সদস্য হন।
রঘু রাই কেবল যুদ্ধের নয়, তিব্বতের দালাই লামা থেকে শুরু করে মাদার তেরেসা, সবার যাপিত জীবনের গভীরতম মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছেন। ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সেই মর্মান্তিক ছবিগুলো আজও বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আলোকচিত্র হিসেবে স্বীকৃত।
২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার রঘু রাইকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। তার ক্যামেরা কেবল আমাদের যুদ্ধের ছবি তোলেনি, বরং আমাদের বিজয়ের গৌরবেও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন ভারতীয় আলোকচিত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাত্তরের এক বিশ্বস্ত সখা।
তার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ হয়তো চিরতরে নিভে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশের ধানক্ষেতে, শরণার্থী শিবিরে আর বিজয়ের মিছিলে তার ফ্রেমবন্দি সেই মুহূর্তগুলো আজীবন কথা বলবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যখন একাত্তরকে দেখতে চাইবে, তখন রঘু রাই-এর ক্যামেরার চোখ দিয়েই তারা খুঁজে পাবে নিজেদের শেকড়কে।
নাগরিক প্রতিদিনের পক্ষ থেকে বিদায় হে প্রিয় একাত্তর-সখা। আপনার তোলা ছবিগুলোই আপনাকে আমাদের মাঝে অমর করে রাখবে।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ঐতিহাসিক আলোকচিত্র আর্কাইভ।