জন্মদিনে ফিরে যাই সেই শিল্পীর কাছে, যিনি শুধু চরিত্রে অভিনয় করেননি; অভিনয় করেছেন একটি দেশের ভয়, ক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতায়।
দূরে হাট বসেছে। কাঁচা রাস্তার দু'পাশে মানুষের ভিড়। হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসে একজন মানুষ। তার চোখে স্থিরতা। ঠোঁটে মৃদু হাসি। আশপাশের মানুষ একটু সরে দাঁড়ায়। কেউ তাকে থামায় না। কেউ প্রশ্ন করে না। কারণ ক্ষমতা কখনো একা আসে না; তার সঙ্গে ভয়ও আসে। তিনি কানকাটা রমজান নন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হুমায়ূন ফরীদিকে কানকাটা রমজানে পরিণত করবেন। আর তখন পুরো পর্দার মালিক হয়ে যাবেন একজন মানুষ হুমায়ূন ফরীদি।
বাংলাদেশে অসংখ্য জনপ্রিয় অভিনেতা এসেছেন। কেউ নায়ক হয়েছেন, কেউ খলনায়ক, কেউ তারকা। কিন্তু খুব কম শিল্পী আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই কোনো চরিত্র নয়, একটি সামাজিক বাস্তবতা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তিনি শুধু চরিত্র অভিনয় করেননি। তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতাকে অভিনয় করেছিলেন।
১৯৫২ সালের ২৯ মে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চুয়ারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন ফরীদি। তার শৈশবের গল্প কোনো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতো নয়। কোনো নাটকীয় উত্থান নেই। কোনো অলৌকিক প্রতিভার কিংবদন্তিও নেই। কিন্তু ছিল একটি বিরল ক্ষমতা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা।
পরবর্তী সময়ে মাদারীপুর, চাঁদপুর এবং ঢাকায় শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের নানা সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণ ফরীদি এমন এক বাংলাদেশকে দেখেছিলেন, যে দেশটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিচ্ছে; কিন্তু একই সঙ্গে বহন করছে ভয়, ক্ষত, অস্থিরতা এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাস।
যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সত্য। হয়তো সেই কারণেই পরবর্তী জীবনে ক্ষমতার চরিত্রগুলো তার অভিনয়ে এত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন তাকে সমাজকে বিশ্লেষণ করতে শিখিয়েছিল। অর্থনীতি তাকে সংখ্যা দেয়। নাটক তাকে মানুষ দেয়। এই দুইয়ের মিলনে গড়ে ওঠে ফরীদি নামের শিল্পী।
বাংলাদেশের নাট্যআন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা থিয়েটার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। হুমায়ূন ফরীদি সেই মঞ্চেই নিজের অভিনয়শৈলীকে শাণিত করেন। সেলিম আল দীনের নাট্যজগত, লোকজ ঐতিহ্য, গ্রামীণ ভাষা, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং মঞ্চের শৃঙ্খলা তার শিল্পীজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। মঞ্চ তাকে একটি শিক্ষা দিয়েছিল চরিত্রকে অভিনয় করা যায় না। চরিত্রকে বুঝতে হয়। এই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাই তার চরিত্রগুলো কখনো মুখোশ মনে হয় না। মনে হয়, তারা আমাদের পরিচিত মানুষ।
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রচলিত ভিলেন সাধারণত গল্পের নায়কের শত্রু। হুমায়ূন ফরীদি এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে দিয়েছিলেন। তার চরিত্রগুলোকে দেখলে মনে হয়, তিনি কোনো ব্যক্তিকে নয়, একটি সামাজিক কাঠামোকে অভিনয় করছেন। চেয়ারম্যান। মোড়ল। দখলদার। সুবিধাভোগী। ক্ষমতাবান মধ্যস্বত্বভোগী। এই চরিত্রগুলো শুধু চলচ্চিত্রের চরিত্র নয়। এগুলো বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোর প্রতীক। এই কারণেই দর্শক তাকে ভয় পেত। কারণ তারা জানত এই মানুষটি বাস্তবেও আছে। হয়তো অন্য নামে। হয়তো অন্য পোশাকে। কিন্তু আছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে ‘সংশপ্তক’-এর কানকাটা রমজান একটি যুগান্তকারী চরিত্র। অনেক বিশ্লেষকের পাঠে এই চরিত্র স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতার এক প্রতীকী রূপ। রমজানকে শুধু একজন অপরাধী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সে এমন এক শূন্যতার প্রতিনিধি, যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল, আইন অনুপস্থিত এবং মানুষ বিকল্প ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য। ফরীদির অভিনয় এই চরিত্রকে বাস্তবতার এমন স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে দর্শক চরিত্রটিকে শুধু দেখে না অনুভব করে। এই কারণেই কানকাটা রমজান আজও স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
অনেকেই হুমায়ূন ফরীদিকে শুধু খলচরিত্রের অভিনেতা হিসেবে মনে রাখেন। কিন্তু ‘ব্যাচেলর’ এর আবরার ভাই সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে তিনি ভয়ের প্রতীক নন। বরং অভিজ্ঞতা, কর্তৃত্ব, নির্ভরতা এবং শহুরে সম্পর্কের এক জটিল রূপ। এই চরিত্র দেখায়, ফরীদি শুধু অন্ধকার অভিনয় করতেন না। তিনি ক্ষমতার মানবিক রূপও বুঝতেন।
হুমায়ূন ফরীদির অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল না তার কণ্ঠ। না তার সংলাপ। না তার জনপ্রিয়তা। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিয়ন্ত্রণ। তিনি জানতেন কখন কথা বলতে হয়। আর তার চেয়েও বেশি জানতেন, কখন চুপ থাকতে হয়। একটি সংলাপের আগে নেওয়া ক্ষণিকের বিরতি। একটি ধীর দৃষ্টি। একটি অসমাপ্ত হাসি। এই ছোট ছোট উপাদান দিয়েই তিনি দৃশ্যের ভেতরে ক্ষমতার অনুভূতি তৈরি করতেন। অনেক অভিনেতা শব্দ দিয়ে অভিনয় করেন। ফরীদি নীরবতা দিয়েও অভিনয় করতে পারতেন।
‘সংশপ্তক’-এ গ্রামীণ ক্ষমতা। ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘জয়যাত্রা’-য় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে দুর্নীতি, প্রভাব, সামাজিক বৈষম্য এবং কর্তৃত্বের নানা রূপ। ফরীদির অভিনীত চরিত্রগুলোকে পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, যেন বাংলাদেশের কয়েক দশকের সামাজিক ইতিহাসের একটি বিকল্প আর্কাইভ। তিনি ইতিহাস লেখেননি। কিন্তু ইতিহাস যাদের জীবন দিয়ে লেখা হয়, তাদের তিনি অভিনয় করেছিলেন। তাই তার চরিত্রগুলো দেখলে শুধু একজন মানুষকে দেখা যায় না। দেখা যায় একটি সময়কে।
হুমায়ূন ফরীদিকে মনে রাখার কারণ শুধু তিনি একজন বড় অভিনেতা ছিলেন এ কথা বলা যথেষ্ট নয়। বড় অভিনেতা আরও ছিলেন। আরও আসবেন। কিন্তু খুব কম শিল্পী আছেন, যারা একটি দেশের ক্ষমতার মুখ এত স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন।
আজও ক্ষমতার পোশাক বদলেছে। অফিস বদলেছে। পদবি বদলেছে। কিন্তু ফরীদির অভিনীত মানুষগুলো হারিয়ে যায়নি। তারা এখনো আমাদের চারপাশে হাঁটে। আমরা শুধু তাদের নাম বদলেছি। চরিত্রগুলো বদলাইনি। আর সেই কারণেই হুমায়ূন ফরীদি শুধু একজন অভিনেতা নন। তিনি বাংলাদেশের সামাজিক স্মৃতির অংশ।