মানুষের ভোজন রসনা তৃপ্তিতে গলদা চিংড়ি বা লবস্টার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। কিন্তু এই সুস্বাদু খাবারের নেপথ্যে যে নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই প্রাণিপ্রেমীরা সরব ছিলেন। এবার সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে বিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী লাইভ সায়েন্স-এর বরাতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিজ্ঞানীদের দাবি, মানুষের মতোই গলদা চিংড়ি তীব্র ব্যথা অনুভব করতে পারে ও তাদের জীবন্ত সেদ্ধ করা নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে।
ধারণা করা হতো যে, গলদা চিংড়ির মতো ক্রাস্টেসিয়ান প্রাণীদের জটিল স্নায়ুতন্ত্র নেই, তাই তারা ব্যথা বোঝে না। কিন্তু প্রাণিবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। তারা লক্ষ্য করেছেন যে, ফুটন্ত পানিতে ছাড়ার পর লবস্টার যেভাবে নড়াচড়া করে বা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, তা কেবল কোনো যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া নয় বরং সেটি তীব্র যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তাদের স্নায়ুতন্ত্র ব্যথার সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে সক্ষম, যা মানুষের ব্যথাবোধের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়।
রেস্তোরাঁগুলোতে গলদা চিংড়ি তাজা রাখার জন্য সেগুলোকে জীবন্ত অবস্থায় গরম পানিতে ফেলে রান্না করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি এই প্রাণীর জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাণি অধিকার কর্মী ও বিজ্ঞানীরা জীবন্ত সেদ্ধ করার এই প্রথা নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, খাদ্যের প্রয়োজনে প্রাণি হত্যা করা হলেও তা যতটা সম্ভব যন্ত্রণাহীন হওয়া উচিত।
ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ডের মতো কিছু দেশ গলদা চিংড়িকে জীবন্ত সেদ্ধ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেসব দেশে নিয়ম করা হয়েছে যে, রান্না করার আগে প্রাণিটিকে যন্ত্রণাহীনভাবে সংজ্ঞাহীন করতে হবে বা নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হত্যা করতে হবে।
এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আমাদের খাবারের পেছনের নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রাণিজগতের প্রতি মানবিকতা প্রদর্শন ও তাদের যন্ত্রণাকে মূল্যায়ন করা আধুনিক বিজ্ঞানের একটি বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীদের এই দাবি যদি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়, তবে ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের ডাইনিং টেবিলে লবস্টার রান্নার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।
তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স।