দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে অনেক শিশুর। ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়েছে সংক্রমণ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে। সোমবার (৩০ মার্চ) স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রের বরাতে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, গত আট সপ্তাহে ঢাকা বিভাগে ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন মারা গেছে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। বাকি তিনজনের মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে।
এছাড়া গত দুই সপ্তাহে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেই ১২টিরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ মার্চ থেকে রোববার (২৯ মার্চ) সকাল পর্যন্ত শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে। এ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুর। চট্টগ্রামে অন্তত ২৪ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। সিলেটেও গত তিনদিনে ৩০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে।
এছাড়া রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় গত দুই সপ্তাহে ১১৬টি নমুনা পরীক্ষায় ছয়জনের হাম ও চারজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মার্চ পর্যন্ত খুলনায় ৯ এবং বরিশালে ৩৯ জন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বন্ধ করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এ কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে হঠাৎ করে হামসহ টিকা প্রতিরোধযোগ্য রোগের বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও প্রশাসনিক কারণ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পূর্বের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বন্ধ করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এতে অপারেশনাল পরিকল্পনার মাধ্যমে টিকা সরবরাহ, অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যে ঢাকা বিভাগের ভেতরে সংক্রমণের আরো বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। ২৮ মার্চ পর্যন্ত গত দুই মাসে এ বিভাগে ৬০১ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৯১ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ঢাকা জেলায় ৩০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৯, নারায়ণগঞ্জে ৩১, নরসিংদীতে ১৬ ও গাজীপুরে ২০ জন আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে মোট ৩৪২টি সন্দেহজনক হাম (মিজলস) রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৪৬ জনের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় এবং ৭৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শিশুদের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে। গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৬০০ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। রোববার বেলা ১টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সাতজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসাধীন ২৫ জন। ছোঁয়াচে রোগ হামের পরিস্থিতি সামলাতে হাসপাতালের এক কোণে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে।
হামের সংক্রমণ দেখা গেছে সিলেটেও। সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের ৪ নম্বর ইউনিটকে আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে ২৬ মার্চ থেকে গত তিনদিনে ৩০ রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালে ১৬ জন ভর্তি আছে।
চট্টগ্রামেও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ২৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১২ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দুই, মা ও শিশু হাসপাতালে ছয়, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই এবং বোয়ালখালী ও হাটহাজারীতে দুই শিশু ভর্তি আছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৭০ শিশু ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি আছে। শিশুদের জন্য কোনো আইসিইউ না থাকায় শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
আগামী জুলাই-আগস্টে সারাদেশে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।