দেশে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঢাকার শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে কেবল জটিলতায় ভোগা শিশুদেরই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ভোলার বাসিন্দা তামান্না আক্তার বিবিসি বাংলাকে জানান, তার সাড়ে এগারো মাস বয়সী ছেলে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে শুরুতে সেটিকে অ্যালার্জি মনে করা হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং সেখান থেকে ঢাকায় আনা হয় শিশুটিকে। বর্তমানে সে রাজধানীর এই বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বুধবার হাসপাতালটি পরিদর্শন করে বিবিসি দেখতে পায়, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য চালু করা বিশেষায়িত ওয়ার্ডের প্রতিটি বেড রোগীতে পূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সন্তানকে ভর্তি করাতে এলেও সিট না থাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আইসিইউ সুবিধাও সীমিত, ফলে গুরুতর রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মাসের মাঝামাঝি থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে এখানে অন্তত ছয়জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চের পর থেকে নিশ্চিতভাবে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে হামে, আর সন্দেহভাজন হিসেবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৩৮ জনের। একই সময়ে ১১ হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ৫৯৯ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডটি সম্প্রতি চালু করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৭০টি বেড রয়েছে। তবে রোগীর চাপ এর চেয়ে অনেক বেশি। ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুদের কারও হাতে ক্যানুলা, কারও অক্সিজেন সাপোর্ট চলছে—যা পরিস্থিতির তীব্রতাই নির্দেশ করে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা আরেক শিশুর ক্ষেত্রেও শুরুতে ভুলভাবে অ্যালার্জি হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসার পরও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন শিশুটির স্বজনরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর, সর্দি, ডায়েরিয়ার পর শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়াই এখন সাধারণ উপসর্গ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। তবে উপসর্গ থাকলেই যে সবাই হাম আক্রান্ত—তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, কারণ অনেকেই সন্দেহভাজন হিসেবে ভর্তি হচ্ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেলায়েত হোসেন ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীদের দেখার সময় বিবিসি বাংলাকে জানান, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসায় সবার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত সক্ষমতা নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
একইভাবে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন যে সংখ্যক রোগী আসছে, সবাইকে আমরা ভর্তি করতে পারি না। অনেককে ফেরত দিতে হয়। যাদের জটিলতা বেশি, শুধু তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে।’
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। পাশাপাশি জ্বরের জন্য উপযুক্ত ওষুধ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন এ দেওয়া যেতে পারে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইসিইউ বেডই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। বিশেষায়িত ইউনিটে ১৪টি আইসিইউ বেড থাকলেও সবগুলোই বর্তমানে পূর্ণ। গুরুতর অবস্থার রোগীদের ক্ষেত্রে অক্সিজেন বা বাবল সিপ্যাপ দিয়ে প্রাথমিক সাপোর্ট দেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আইসিইউতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সীমিত বেড ও আইসিইউ সুবিধার কারণে শিশু হাসপাতালে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জটিলতা বেশি—এমন রোগীদেরই অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ