প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস। এই দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আহ্বান—হিমোফিলিয়া ও অন্যান্য বংশগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সমাজে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই দিবসের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ এখানে এখনো অনেক রোগী সঠিকভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
মানুষের শরীরে আঘাত লাগলে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি ঠিকমতো কাজ করে না। সামান্য আঘাতেও দীর্ঘ সময় ধরে রক্তপাত হয়। এই অবস্থাকেই বলা হয় হিমোফিলিয়া, যা একটি বংশগত (জেনেটিক) রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই অজান্তে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করেন, কারণ বাহ্যিক রক্তপাতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
হিমোফিলিয়া কী?
হিমোফিলিয়া এমন একটি রোগ যেখানে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লটিং ফ্যাক্টর (প্রোটিন) শরীরে কম বা অনুপস্থিত থাকে। প্রধানত দুই ধরনের হিমোফিলিয়া দেখা যায়—হিমোফিলিয়া ‘এ’ (ফ্যাক্টর VIII-এর ঘাটতি) এবং হিমোফিলিয়া ‘বি’ (ফ্যাক্টর IX-এর ঘাটতি)। এই ফ্যাক্টরগুলোর অভাবে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না এবং ভেতরে (বিশেষ করে জয়েন্ট, মাংসপেশী ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে) রক্তক্ষরণ হতে পারে। অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান আঘাত ছাড়াই হঠাৎ রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে, যা রোগটিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশে হিমোফিলিয়ার চিত্র
বাংলাদেশে হিমোফিলিয়া একটি অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর রেজিস্ট্রি অনুযায়ী দেশে মোট নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ২৭৯ জন। এর মধ্যে হিমোফিলিয়া ‘এ’ (ফ্যাক্টর VIII ডেফিসিয়েন্সি) রোগী ৩ হাজার ৫২৯ জন, হিমোফিলিয়া ‘বি’ (ফ্যাক্টর IX ডেফিসিয়েন্সি) রোগী ৬৫১ জন এবং অন্যান্য রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯৯ জন।
তবে এই নিবন্ধিত সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব হিমোফিলিয়া (ডব্লিউএফএইচ)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ পুরুষের মধ্যে প্রায় ১৭০ জন হিমোফিলিয়া ‘এ’ রোগে আক্রান্ত, যা থেকে অনুমান করা যায় দেশে প্রায় ১৭ হাজার পুরুষ হিমোফিলিয়া ‘এ’ রোগী থাকতে পারে। একইভাবে, প্রায় ৭ হাজার ৬০০ জন হিমোফিলিয়া ‘বি’ রোগী থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এই তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, প্রকৃত রোগীর সংখ্যা এবং নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো—সচেতনতার অভাব, বিলম্বে রোগ নির্ণয়, এবং গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা।
গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সচেতনতার অভাব, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চমূল্যের ওষুধ—সব মিলিয়ে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পান না। ফলে তারা জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসেন, যখন ইতোমধ্যে জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় বা স্থায়ী অক্ষমতা তৈরি হয়।
লক্ষণগুলো কী?
হিমোফিলিয়ার লক্ষণ সাধারণত শৈশব থেকেই দেখা যায়, তবে অনেক সময় তা গুরুত্ব পায় না। সামান্য আঘাতেই দীর্ঘ সময় রক্তপাত হওয়া। নাক বা মাড়ি থেকে বারবার রক্ত পড়া। ইনজেকশন বা দাঁত তোলার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ—এসব লক্ষণ প্রাথমিকভাবে দেখা যায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো জয়েন্টে রক্তক্ষরণ। বিশেষ করে হাঁটু, কনুই ও গোড়ালিতে ফোলা, ব্যথা এবং চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
যদি এই জয়েন্ট ব্লিডিং বারবার হয়, তবে তা স্থায়ী জয়েন্ট ড্যামেজ এবং বিকলাঙ্গতার কারণ হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে তা জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করে, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
কেন এটি বিপজ্জনক?
হিমোফিলিয়া শুধু একটি ‘রক্তপাতের সমস্যা’ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ। বাহ্যিক রক্তপাতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ অনেক সময় দৃষ্টিগোচর হয় না, ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়। এই বিলম্বই রোগটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে বিলম্ব হয়। ফলে জটিলতা সৃষ্টি করে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এবং তাদের শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
হিমোফিলিয়ার স্থায়ী নিরাময় এখনো না থাকলেও আধুনিক চিকিৎসায় এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে, ক্লটিং ফ্যাক্টর প্রতিস্থাপন থেরাপি (ফ্যাক্টর VIII বা IX) বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরীরে অনুপস্থিত ফ্যাক্টর সরবরাহ করা হয় এবং রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগীরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
তবে, বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে এই চিকিৎসা এখনো ব্যয়বহুল এবং সীমিত পরিসরে উপলব্ধ। অনেক রোগী কেবল জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসা পান, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়। যদিও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও সার্বিকভাবে চিকিৎসা সহজলভ্য করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবসের তাৎপর্য
বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবসকে শুধু একটি দিন বললে ভুল হবে, এটি একটি আন্দোলন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হিমোফিলিয়া রোগীরা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের জন্য সমান চিকিৎসা ও সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দিবসের মূল বার্তাগুলোতে নারী ও কিশোরীদের রক্তক্ষরণজনিত সমস্যার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে এই দিকটি উপেক্ষিত ছিল।
বাংলাদেশে এই দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সেমিনার ও স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেমিনার ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা হয়।
আমাদের করণীয়
হিমোফিলিয়ার মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। পরিবারে ইতিহাস থাকলে আগেভাগে পরীক্ষা ও জেনেটিক কাউন্সেলিং করা উচিত। শিশুদের অস্বাভাবিক রক্তপাতকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্যখাতে দক্ষতা বাড়ানো, জেলা পর্যায়ে নির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ, এবং ক্লটিং ফ্যাক্টর সহজলভ্য করা—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যাতে কেউ অজ্ঞতার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।
শেষমেশ
হিমোফিলিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়। এটি একটি বংশগত অবস্থা। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ভয় বা কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি, সমর্থন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—যেখানে সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এখন সময় এসেছে শুধু জানার নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার—যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি হিমোফিলিয়া রোগী একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পায়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ