বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের চার সদস্যের বিদেশযাত্রায় অনুমতি চেয়ে করা আবেদন আবারো নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। সোমবার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ। এ তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন।
আহমেদ আকবর সোবহান এবং তার পরিবারের সদস্যরা এর আগেও একাধিকবার বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু বিজ্ঞ আদালত সেসব আবেদনও নাকচ করে দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আহমেদ আকবর সোবহান, তার স্ত্রী আফরোজা বেগম এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরেও তারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে পুনরায় আবেদন করেন।
সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে করা আবেদনটিও আদালত নাকচ করে দেন।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, আহমেদ আকবর সোবহানের সঙ্গে বিদেশযাত্রার অনুমতি চেয়ে সবশেষ আবেদনটি করেছিলেন তার স্ত্রী আফরোজা বেগম, ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানভীর ও সাফওয়ান সোবহান এবং ছেলে সায়েম সোবহান আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সোবহান। তাদের পক্ষে আবেদনটি করেন আইনজীবী এনামুল হক সর্দার। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী গোলাম মোস্তফা, বোরহান উদ্দিন ও খোরশেদ আলম।
অন্যদিকে, আদালতে আবেদনের বিরোধিতা করে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম, দেলোয়ার জাহান রুমি ও তরিকুল ইসলাম। শুনানিতে দেলোয়ার জাহান রুমি বলেছেন, ‘আহমেদ আকবর ও আফরোজার নামে মামলা রয়েছে। তারা জামিন না নিয়ে বিদেশ যেতে পারেন না। অন্য তিনজন আদালতে হাজির না হয়ে তো এই অনুমতি পেতে পারেন না।’ শুনানি শেষে আবেদনটি নামঞ্জুর করেন আদালত।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ তার পরিবারের আট সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন। শুনানি শেষে আবেদনটি মঞ্জুর করেন আদালত।
নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, ভূমি জবরদখল, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর, রূপান্তরসহ মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনের অপরাধের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান। এ জন্য অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে দুদক। এরই মধ্যে দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছেন অভিযুক্তরা। এ জন্য তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন।
আদালত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে আরো বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়েছে।
আদালত ও দুদক জানাচ্ছে, আহমেদ আকবর সোবহান ও তার স্ত্রী আফরোজার নামে ইতোমধ্যে মামলা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, ভূমি জবরদখল, ঋণ জালিয়াতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
দুদকের আইনজীবীদের মতে, মামলা থাকার কারণে তারা জামিন না নিয়ে বিদেশ যেতে পারেন না। এছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা সরাসরি আদালতে হাজির না হয়ে এই ধরণের অনুমতি পেতে পারেন না বলে আদালত অভিমত দিয়েছেন।
দুদকের আশঙ্কা, অভিযুক্তরা বিদেশে চলে গেলে চলমান অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং তারা দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর তাদের ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বিদেশে তাদের সম্পদের বিবরণ
বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বসুন্ধরা পরিবারের বিপুল পরিমাণ সম্পদের হদিস পাওয়া গেছে:
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের সারে এলাকায় এই পরিবারের একাধিক বিলাসবহুল সম্পত্তি রয়েছে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমে তারা সেখানে প্রায় ১৩ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি কিনেছেন বলে জানা যায়। একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যে এই পরিবারের মালিকানাধীন ২৬টি সম্পত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিনিয়োগ ও নাগরিকত্ব: আহমেদ আকবর সোবহান ও তার স্ত্রী আফরোজা বেগম সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাদের ছেলে সায়েম সোবহান আনভীর স্লোভাকিয়া এবং ইয়াশা সোবহান সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য যথাক্রমে ৩ মিলিয়ন ইউরো ও ২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছেন।
ব্যাংক হিসাব: সুইজারল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং আইল অফ ম্যান-এর বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের নামে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
আদালত ইতোমধ্যে এই পরিবারের সদস্যদের ছয়টি দেশ এবং দুটি অফশোর এখতিয়ারে থাকা ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার আদেশ দিয়েছেন।