সময়ের চাকা ঘুরে গেছে দীর্ঘ ২৭টি বছর। যে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় একসময় ছিল আস্থার প্রতীক, ১৯৯৯ সালের এক কালরাত্রিতে সেখানেই রচিত হয়েছিল এক বীভৎস বিশ্বাসঘাতকতার উপাখ্যান। ডিবির নিজস্ব সোর্স জালাল আহমেদ শফি, যিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ছায়ার মতো কাজ করতেন, তাকেই প্রাণ দিতে হয়েছিল নিজ দপ্তরের মানুষের হাতে। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রোববার (৩ মে) সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায় দিলেন আদালত।
ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে যখন বিচারক মোসাদ্দেক মিনহাজ রায় ঘোষণা করছিলেন, তখন পিনপতন নীরবতায় যেন ২৭ বছর আগের সেই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। আদালত মামলার তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডিতরা হলেন, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ ও ডিবি ক্যান্টিন পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন।
ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চের। লালমাটিয়ার বাসা থেকে ডিবির সোর্স জালাল আহমেদ শফিকে মাইক্রোবাসে করে ডেকে আনা হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তাকে নিয়ে আসা হয় ডিবি অফিসে। সেখানে তাকে আপ্যায়নের ছলে পানি খাওয়ানো হয়, কিন্তু নিয়তি ছিল অন্য কিছু। রাতের অন্ধকারে অফিসের ছাদের নির্জনে নিয়ে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহটি গুম করার উদ্দেশ্যে অফিসের পানির ট্যাংকের ভেতরেই ফেলে রাখা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ সত্য। সোর্স জালাল মূলত ডিবির হয়ে স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের খবর দিতেন। আসামিরা তার দেওয়া তথ্যে পণ্য আটক করলেও জালালকে তার প্রাপ্য ভাগ থেকে বঞ্চিত করতেন। ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ জালাল ক্ষুব্ধ হয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের এক বড় তথ্য ডিবির অন্য একটি দলকে দিয়ে দেন। এতেই রাগে ফেটে পড়েন ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসান। সেই আক্রোশ থেকেই সাজানো হয় হত্যার নীল নকশা।
৩১ মার্চ ডিবি অফিসের ছাদের পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে যখন অর্ধগলিত মরদেহটি উদ্ধার করা হয়, তখন কেউ জানত না এটি কার। ম্যাজিস্ট্রেট ও সিআইডির উপস্থিতিতে পরিচয় শনাক্তের পর জানা যায়, এটি সেই মাইক্রোবাস চালক জালাল আহমেদ শফি, যাকে ২০ মার্চ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আনা হয়েছিল। পিতার নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর মর্গে এসে মরদেহ শনাক্ত করেন তার ছেলে আব্বাস উদ্দিন।
পুলিশের এই অন্ধকার অধ্যায়টি আড়াল করার চেষ্টা কম হয়নি। প্রথম অভিযোগপত্রের পর আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমানের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে প্রকৃত দোষীদের নাম। দীর্ঘ দুই যুগ পেরিয়ে সেই অন্ধকার মিন্টো রোডের ছাদে আজ যেন এক চিলতে ন্যায়বিচারের আলো এসে পড়ল। ৪৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি আর ধুলো জমা নথির আড়ালে চাপা পড়া সত্য আজ প্রকাশিত হলো আদালতের রায়ে।