জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলেছিল। তবে ঢাকার দুই সিটিসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে বিএনপির ছয়জন নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় নির্বাচন কবে হবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকরা সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের বহু জনপ্রতিনিধি আত্মগোপনে যান কিংবা গ্রেপ্তার হন। জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকায় নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে—এমন যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক দিনের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
সেই সময় জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি উঠলেও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জাতীয় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিষয়টি পিছিয়ে পড়ে। তবে চলতি ফেব্রুয়ারির শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলে।
এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ঢাকাসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে দলটির নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। ফলে এসব সিটিতে নির্বাচন শিগগির হবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন-কানুন সংশোধনের প্রয়োজন, আবহাওয়াজনিত প্রতিবন্ধকতা ও অন্যান্য সংকটের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসক দিয়ে সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কাউন্সিলর পদ শূন্য থাকায় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই বলে তারা মনে করছেন।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট ও খুলনা সিটি করপোরেশনে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া সবাই বিএনপির নেতা, যাদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিতও হয়েছিলেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বা সিটি করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, সরকারের আস্থার প্রতিদান দিতে তারা কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করবেন এবং এরপর নির্বাচনের পথে যাওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিটি করপোরেশন মূলত মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর নিয়ে গঠিত। সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবু আলম শহীদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, কাউন্সিলর ছাড়া নাগরিক সেবা কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।
আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ১ জুন, ঢাকা উত্তরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৫ সালের ২ জুন এবং চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২২ ফেব্রুয়ারিতে। গত ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আয়োজনের জন্য চিঠি দিয়েছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, মেয়াদ অনুযায়ী ধাপে ধাপে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরও বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে কি না—সে সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদ নেবে।
ছয় সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি বলে দাবি করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনগুলো গঠন না হলে নাগরিক ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকটও গভীর হতে পারে।