সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা বহু অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, গণভোট, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি কিংবা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত অবস্থান জানায়নি সরকার। তবে আলোচিত দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বহাল রাখার ইঙ্গিত মিলেছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, অনেক অল্প সময়ে এত বেশি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়ে পাঁচ দিনেরও কম সময় ব্যয় হয়েছে।
এদিকে আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি থাকবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে না। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে—এমন কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করে সংসদে তোলা হবে। তবে কোন কোন অধ্যাদেশ সেই তালিকায় থাকবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি।
বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশ নিয়ে বিএনপির আপত্তি আগের মতোই রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন পেলেও এই আদেশ জারির সময়ই বিএনপি এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পরও দলটি সেই অবস্থানেই রয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে, বিএনপি ও তার মিত্রদের ২১২ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার ঘটনায়।
আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা কিছু অধ্যাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তবে দায়মুক্তি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। জাতীয় নির্বাচনের আগে জারি করা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি থাকলেও বিএনপি সরকার এটিকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তা করছে। সরকারের যুক্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিপুল প্রাণহানি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যার আবেগ-অনুভূতির দিক বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এই অধ্যাদেশে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান থাকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে সংবিধান পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছিল। তবে জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন থাকায় এই অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তুলনামূলক কম।
গণভোট সম্পর্কিত অধ্যাদেশ নিয়েও সরকার এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। যদিও গণভোটে হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হয়েছে, বিশ্লেষকদের মতে, এতে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে বলেও মত তাদের।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছরে উন্নীত করা অধ্যাদেশ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশ নিয়েও সরকার ভাবনাচিন্তায় রয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো কোনো দল প্রকাশ্যে আপত্তি না তুললেও, বিএনপি সরকার এসব অধ্যাদেশ বহাল রাখবে কি না—তা নিয়ে অপেক্ষা চলছে।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি নিয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি বর্তমান বিএনপি সরকার। যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হলেও কোন কোন অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদনের জন্য তোলা হবে এবং কোনগুলো বাদ পড়বে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। ফলে সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগে ও পরে এই অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটবে কি না, সেদিকেই নজর রাখছেন আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।