জুলাই সনদ বাস্তবায়ন
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলেছেন, রোববার (১৫ মার্চ) ৩০ দিন পূর্ণ হলেও যদি সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করে, তবে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে এবং জাতির কাছে তারা ক্ষমা পাবে না। একই সঙ্গে বিষয়টি সংসদের ভেতরে উত্থাপন করা হবে বলেও জানান তারা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিবার (১৪ মার্চ) বেলা ১১টায় ১১ দলীয় জোটের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুপুর সাড়ে ১২টায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে ব্রিফিংয়ে জামায়াত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আজাদ এসব কথা বলেন।
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের নিজেদের উপদেষ্টারাই বিভিন্ন বক্তব্যে নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একজন উপদেষ্টাকে পরে মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে—নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন। আবার আরেকজন উপদেষ্টা গণমাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে স্বীকার করেছেন—কীভাবে কিছু রাজনৈতিক শক্তিকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে নির্বাচন প্রত্যাশা করেছিলাম এবং জনগণ যে নির্বাচন আশা করেছিল, বাস্তবে সেই নির্বাচন হয়নি, বিশেষ করে ফলাফলের ক্ষেত্রে। এর পরও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় আমরা নির্বাচন মেনে নিয়েছি। আমাদের নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিয়েছেন এবং জাতীয় সংসদে অংশগ্রহণ করেছেন।’
জামায়াত নেতা বলেন, ‘একই দিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যটি ছিল জুলাই সনদের ওপর গণভোট। প্রেসিডেনশিয়াল আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ জারি হয়েছে এবং দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতেই এটি নির্ধারিত হয়েছে। যেহেতু জনগণের ভোটে এই সনদ পাস হয়েছে, তাই এটি বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই সনদের ৬ থেকে ১১ বা ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ অধিবেশন আহ্বানের প্রক্রিয়াও স্পষ্ট করা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দেবেন এবং রাষ্ট্রপতি সেই অনুযায়ী অধিবেশন ডাকবেন।’
১১ দলীয় জোটের মুখপাত্র অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকা হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অধিবেশন ডাকা হয়নি। বিএনপির সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে জাতীয় সংসদের শপথ নিয়েছেন, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। অথচ তারাই ঐকমত্য কমিশনে অংশ নিয়েছিলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন সেই অবস্থান থেকে সরে যাওয়া জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ, যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, তাদের মতামতকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। আগামীকাল (রোববার) সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন বসবে, কিন্তু এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অধিবেশন ডাকা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘আগামীকাল পঞ্জিকা অনুযায়ী ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে যদি সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকে, তাহলে সরকারকে এর দায় নিতে হবে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এ অবস্থায় জাতির কাছে সরকার ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাকে এই প্রক্রিয়ার সূচনা করতে হবে এবং সরকারকেও দায়িত্ব নিতে হবে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে সংসদের ভেতরে তাদের সংসদ সদস্যরা বিষয়টি উত্থাপন করবেন। পাশাপাশি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নেওয়া হলে এবং আগামীকালের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন তারা। খুব শিগগিরই শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ছয়টি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানিয়েছে ১১ দল। এটি আবার কোনো ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ কিনা—সেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী এসব পদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। প্রশাসক নিয়োগের অর্থ নির্বাচন এড়িয়ে যাওয়া, বিলম্ব করা অথবা নতুন কোনো নির্বাচন প্রকৌশলের পথ তৈরি করা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসনে এখন ব্যাপক দলীয়করণ চলছে। কোনো কর্মকর্তা যদি দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ না করেন, তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে পেশাগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতীতে যেভাবে দলীয় স্বার্থে মেধাহীন লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল, সেই একই প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়েছে। এসব কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আন্দোলনের সময়সূচি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, এখনই নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা হচ্ছে না। সামনে ঈদ রয়েছে এবং বাস্তবতার কারণে অনেক নেতাকর্মী উমরাহ বা ইতিকাফে আছেন। তাই আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নির্ধারণের জন্য আগামী ২৮ মার্চ শীর্ষ নেতাদের একটি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ওই বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।
বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল অতীতের নানা বিকৃতি ও সমস্যা দূর করা। সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে যে বিকৃতি তৈরি হয়েছে এবং যার ফলে স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই এই সংস্কার প্রক্রিয়া। এখন কেউ যদি বলে, কিছু মানবে আর কিছু মানবে না, তাহলে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
উদাহরণ দিয়ে জামায়াত নেতা বলেন, একজন মা যদি সন্তানের জ্বর সারাতে ওষুধ খাওয়াতে চান, আর শিশু যদি মিষ্টি খেয়ে ওষুধ ফেলে দেয়, তাহলে রোগ সারবে না। সংস্কারের ক্ষেত্রেও যদি পছন্দ মতো কিছু নেওয়া হয়, আর বাকিটা বাদ দেওয়া হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই জুলাই সনদের আংশিক নয়, পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চান তারা।
জাতীয় সংসদে জাতীয় সংগীত চলাকালে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বসে থাকার বিষয়ে নাগরিক প্রতিদিনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেদিন সংসদে যা ঘটেছে তা সবাই দেখেছেন।’ নতুন স্পিকারের আলোচনায় বিরোধীদল দাবি করেছিল—‘স্বৈরাচারের’ (রাষ্ট্রপতি) কোনো বক্তব্য যেন সংসদে স্থান না পায়। কিন্তু সেই দাবি মানা হয়নি। ফলে সংসদীয় রীতি মেনেই বিরোধীদল তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে।