দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর পর এবার ৪২টি জেলা পরিষদেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সচল ও কার্যকর হবে বলে সরকারের দাবি থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এসব পদ কি দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসনকেন্দ্রে’ পরিণত হচ্ছে?
সরকার ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সর্বশেষ রোববার (১৫ মার্চ) এক প্রজ্ঞাপনে ৪২টি জেলা পরিষদেও বিএনপির নেতাদের প্রশাসক করা হয়। সরকারের আশা, নতুন প্রশাসকদের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিক নেতারা কার্যকর হতে পারেন ঠিকই, কিন্তু দলীয় নেতাদের এই নিয়োগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিলম্ব এবং এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতও হতে পারে।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে। তখন এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শীর্ষ পদেই আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন। পরে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে এখনো সরকারি কর্মকর্তারাই প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদ নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে। ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রশাসক হয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান। খুলনায় প্রশাসক করা হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। গাজীপুরে প্রশাসক হয়েছেন মহানগর বিএনপি সভাপতি শওকত হোসেন সরকার, নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন এবং সিলেটে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।
পরে বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ৪২টি জেলা পরিষদেও বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় জনসেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে যাদের প্রশাসক করা হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন, আবার কেউ দলীয় মনোনয়ন চেয়েও পাননি। এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কাউকে সান্ত্বনা আবার কাউকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য তারিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই সবচেয়ে কার্যকর। তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসকরা সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে নগর বিশেষজ্ঞ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রশাসক দিয়ে নগর পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। তার মতে, সরকারের উচিত দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু সেটি না করে যা করা হয়েছে সেটি হলো—দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন। নির্বাচন না দিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ ভালো বার্তা দেয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে সিটি করপোরেশনগুলোতে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সংসদের বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও বলেছিল, দলীয় পদধারীদের প্রশাসক করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।