ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সরকারি বিশেষ বিধান জারি করে ড. ইউনূসের সরকার। যাতে বাংলাদেশের শ্রমিক কল্যাণের বিপক্ষে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়াকে পূরণ করা হয়েছে। ফলে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিকদের জন্য আর অতীতের মতো ৫ শতাংশ মুনাফা দিতে হবে না। শ্রমিকদের ভাগ্যে জুটবে ১.৫ শতাংশ। এ রকমই তথ্য জানা যাচ্ছে অনুসন্ধানে।
ফিরে তাকানো যেতে পারে সদ্য অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনের দিকে। ভোট হয়ে গেছে। ফলাফলও হাতে এসে গেছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। ফলাফলও হয়ে গেল। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেবে নতুন সরকার। ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এমন সন্ধিক্ষণেও তড়িঘড়ি করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ১৮ মাসের দায়িত্ব শেষে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে শ্রম মন্ত্রণালয়ের জারি করা সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যমান লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিককে দেওয়ার যে বিধান, তা বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১.৫ শতাংশ মুনাফা দেবে শ্রমিকদের। আর এর মাধ্যমে দেশের শ্রমিকদের একরকম বিক্রি করে দিলেন নোবেলজয়ী ড. ইউনূস ও তার অন্তবর্তী সরকার।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছরের ১৮ নভেম্বর একটি চিঠি ইস্যু করে শ্রম মন্ত্রণালয়। যেখানে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ধারা সংশোধন করা দরকার। যে চিঠি পাঠিয়েছেন নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ডাকা হয় জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের বৈঠক। যেখানে মুনাফা কমানোর তীব্র আপত্তি জানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা। অভিযোগ তোলা হয়, শেভরনের মতো কিছু মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দিতেই এই উদ্যোগ।
ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে এমন প্রজ্ঞাপন জারিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন শেভরনের কর্মীরাও। শেভরনের এক কর্মী বলেন, ‘তৎকালীন উপদেষ্টা ছিলেন সাখাওয়াত সাহেব। উনার সঙ্গে আমরা দেখা করি এবং আমরা ব্যাপারটা কিন্তু তার কাছে খুলে বলি যে এটা কেন আমাদের ন্যায্য পাওনা। সেই ক্ষেত্রে কিন্তু তিনি অকপটে বললেন যে হ্যাঁ তোমাদের এটা ন্যায্য, কিন্তু আমার ওপরে প্রেশার আছে, আমি এটার এগেইনস্টে কিছু করতে পারব না।’
শেভরনের আরেকজন কর্মী বলেন, ‘এটা একটা সাবজেক্টিভ ম্যাটার। দুই নম্বর হলো কয়েকদিন পরেই ইলেকশন হচ্ছে এবং একটা নির্বাচিত সরকার আসতেছে। সো আমরা তাদেরকে বারবার বলার চেষ্টা করছি যে এই মুহূর্তে আপনাদের জন্য এরকম একটা আইন করা কখনোই উচিত হবে না।’

শেভরনের তৃতীয় আরেকজন কর্মী বলেন, ‘দেশের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভও ওই রকম ইয়ে হচ্ছে না। এটা না হলে এই যে যদি এটা যদি না থাকত তাহলে সবাই কিন্তু রেমিট করে এটা দেশের বাইরে চলে যেত।’
কার চাপে শেষ সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার? জবাব জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি সাবেক শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার সোজাসাপ্টা জবাব দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চাপ ও মার্কিন বিনিয়োগ বন্ধের হুমকিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাবেক শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত আরও বলেন, ‘তো আমি সেখান থেকে ওদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলাম। টিসিসি রাজি হলো না। শ্রম মন্ত্রণালয়ের আর কোনো উপায় নেই যে এটা আমরা যদি এখানে বলব যে করব না, ওখানে বলে ইনভেস্টমেন্ট আসবে না। এবং থ্রেট করল যে ইনভেস্টমেন্ট আসবে না। ট্যারিফ আরও নামানোর কথা নামবে না।’
মোবাইল ফোনে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাউজুল কবির খান বলেন, শ্রমিকের মুনাফা ৫ শতাংশের কারণে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে অংশ নেয় না মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।

পুরো ঘটনার সাক্ষী শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার। ইউনূস সরকারের এমন সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘সাখাওয়াত সাহেবের জন্য এটা ঠিকই একটা কলঙ্কজনক। এই যে দেড় পার্সেন্ট করল এত বিরোধিতার করার পরও। এটা লেবার ল-এর পুরোপুরি লঙ্ঘন হয়েছে। রাজনৈতিক সরকার যাতে সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, সেই সুযোগ যাতে না পায় তার জন্য তড়িঘড়ি করে এই কাজটা করে গেছেন।’
বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও ২০২৩ সালে দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন হুমকি দিয়েছিলেন, শ্রম অধিকার রক্ষা না হলে দেওয়া হবে নিষেধাজ্ঞা। শ্রমিকরা কথা বললেও ঘটনার বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি শেভরনও।
