হার্টে রিং পরাতে গিয়ে সর্বস্ব হারানো পরিবার, কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে করাতে শেষ হয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তের সঞ্চয়, এমন গল্প এখন বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের বাস্তবতা। চিকিৎসার খরচ মেটাতে কেউ জমি বিক্রি করছেন, কেউ ঋণে ডুবে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক বাজেট সাজানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
বিএনপি সরকারের আসন্ন জাতীয় বাজেটে হৃদরোগ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে সেগুলোর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসায় কর ছাড়, অন্যদিকে ক্ষতিকর পণ্যে বাড়তি কর, সব মিলিয়ে এবারের বাজেট জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হৃদরোগীদের ব্যবহৃত কার্ডিয়াক স্টেন্ট বা হার্টের রিংয়ের ওপর থাকা মূল্য সংযোজন কর কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ তৈরির কাঁচামালের ওপরও কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমে আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের হার্টে স্টেন্ট বসানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই চিকিৎসার খরচ অনেকের নাগালের বাইরে। হাসপাতাল ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী একটি স্টেন্ট বসাতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অন্যদিকে কিডনি রোগীদের সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত ডায়ালাইসিস করতে হয়।
বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে একজন রোগীর মাসিক খরচ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। ওষুধ ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হলে এই চাপ আরও বাড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর ছাড় কার্যকর হলে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ বাড়বে এবং সবচেয়ে বেশি উপকার পাবেন নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়।
তবে বাজেটের আরেকটি বড় দিক হলো তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা। সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ধূমপান কমানোর কৌশল হিসেবেও এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিগারেটের দাম প্যাকেটপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের সিগারেট, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য ও মদজাতীয় পানীয়েও বাড়তি কর আরোপের আলোচনা চলছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকের দাম বাড়লে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ধূমপান কমে। বাংলাদেশে প্রতিবছর হৃদরোগ, ক্যানসার, ফুসফুসের রোগ ও স্ট্রোকসহ তামাকজনিত নানা জটিলতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। তাই সিগারেটের ওপর বাড়তি করকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু কর কমালেই চিকিৎসা সস্তা হবে না। হাসপাতালের অতিরিক্ত চার্জ, বাজারের মধ্যস্বত্বভোগী ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে কর ছাড়ের পুরো সুবিধা সাধারণ রোগীরা নাও পেতে পারেন। একইভাবে সিগারেটের দাম বাড়ার সুযোগে যেন অবৈধ ও নিম্নমানের তামাকপণ্যের বাজার না বাড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেট জনস্বাস্থ্যকে সামনে রেখে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যেখানে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সহজ করার চেষ্টা থাকবে, আবার ক্ষতিকর অভ্যাস থেকেও মানুষকে দূরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।