পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবারও উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৯তম এ জামাত অনুষ্ঠিত হবে ঈদের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ৯টায়।
এ ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন হয়বতনগর এ. ইউ. কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে মাঠের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসন জানিয়েছে, শোলাকিয়ার ঐতিহ্য ও খ্যাতির কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশ থেকে আসা মুসল্লিরাও প্রতিবছর এই জামাতে অংশ নেন। প্রতিবছরই মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খান বাহাদুর ১৮২৮ সালে কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে প্রায় সাত একর জমির ওপর ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম জামাতে প্রায় সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নেওয়ায় এর নাম হয় ‘সোয়া লাখি মাঠ’, যা পরে উচ্চারণের পরিবর্তনে ‘শোলাকিয়া’ নামে পরিচিতি পায়।
এবারের ঈদ জামাত উপলক্ষ্যে মাঠের ২৬৫টি কাতারের জন্য দাগ টানা শেষ হয়েছে। আগাছা পরিষ্কার ও ছোট ছোট গর্ত ভরাট করে মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে। ঈদ জামাত ঘিরে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হবে।
এদিকে দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ভৈরব ও ময়মনসিংহ থেকে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামের দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে। ভৈরব থেকে বিশেষ ট্রেন ভোর ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। অন্যদিকে ময়মনসিংহ থেকে বিশেষ ট্রেন ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। উভয় ট্রেনই ফিরতি যাত্রা শুরু করবে দুপুর ১২টায়।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাঠে ৫০টি অস্থায়ী অজুখানা, ২০টি স্থায়ী টয়লেট ও ২০টি ইউরিনালের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুই হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার দুটি অস্থায়ী পানির ভ্যান স্থাপন করা হবে। মাঠসংলগ্ন পুকুরেও অজুর ব্যবস্থা থাকবে। চিকিৎসা সেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীসহ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, শোলাকিয়ার ঈদ জামাতের মতো এত বড় জামাত উপমহাদেশে বিরল। লাখো মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায়ে আলাদা ধর্মীয় আবেগ ও তৃপ্তি কাজ করে। তবে ঐতিহাসিক এই মাঠের স্থায়ী সংস্কার ও তদারকির অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক ও শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য থাকা-খাওয়া, সুপেয় পানি, চিকিৎসাসেবা, টয়লেট ও অজুখানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি আরও জানান, ঈদগাহ মাঠ ও পুরো শহরের নিরাপত্তায় প্রায় ৬০০ পুলিশ সদস্য, দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য ও ৫৫ জন র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবেন। মাঠে চারটি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে এবং পুরো এলাকাকে আটটি সেক্টরে ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করবেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিরা জায়নামাজ ছাড়া অন্য কোনো বস্তু নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং প্রবেশপথে তল্লাশির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মুসল্লিদের নিরাপত্তায় ৩২টি চেকপোস্ট, সাতটি আর্চওয়ে, ৫০টি মেটাল ডিটেক্টর, ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও চারটি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। মাঠে প্রবেশের আগে তল্লাশি চালানো হবে। পাশাপাশি বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও ড্রোন নজরদারিও থাকবে।
র্যাব-১৪-এর কোম্পানি কমান্ডার আলী নোমান বলেন, শতাধিক র্যাব সদস্য কয়েক স্তরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। ওয়াচ টাওয়ারে স্নাইপার মোতায়েনসহ ড্রোন ও বাইনোকুলার দিয়ে তদারকি চালানো হবে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, এবার অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে তিনবার বন্দুকের গুলি ছুড়ে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের নামাজ চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শোলাকিয়া ঈদ জামাতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।