পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বাড়তি বরাদ্দ সত্ত্বেও হাওর, চর ও অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য পর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘ওয়াশ সেক্টর এডিপি অ্যলোকেশন এফওয়াই২০২৬-২৭: হাওর, চর লেফট বিহাইন্ড, বাজেট মিসেস ইকুইটি টার্গেটস’ শীর্ষক নীতি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠান দুটি। এতে ওয়াশ খাতে প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে এডিপি বরাদ্দ বেড়ে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। গত তিন বছর ধরে এ খাতে বরাদ্দ কমার যে প্রবণতা ছিল, তা এবার থেমেছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকার তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ অনেক কম।
পিপিআরসি ও ওয়াটারএইডের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটি ওয়াশ খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সংকট ও বৈষম্য দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। জাতীয় বাজেট ৯.৩৮ শতাংশ এবং মোট এডিপি ৩.১৬ শতাংশ বাড়লেও ওয়াশ খাতের আপেক্ষিক অংশ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নিরাপদ পানি ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন থেকে এখনো প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত। এখন প্রয়োজন নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
প্রতিবেদনে শহরকেন্দ্রিক বরাদ্দ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে বড় ধরনের সেবা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় ৭২ শতাংশই শহরাঞ্চলে যাচ্ছে। চারটি ওয়াসার সম্মিলিত বরাদ্দ তিন হাজার ৫১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ছয় হাজার ৬৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা একাই পেয়েছে পাঁচ হাজার ১০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে গ্রামীণ পানি ও স্যানিটেশন সেবার প্রধান প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বরাদ্দ কমে তিন হাজার ৪২৭ কোটি ৮৫ লাখ থেকে দুই হাজার ৪০৮ কোটি ১৯ লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা বিশেষ উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪১.৮ শতাংশ মানুষ এখনও নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা থেকে ও ৬০.৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
দুর্গম অঞ্চলের বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বরাদ্দ ২০৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৭৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে হাওর এলাকার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের বরাদ্দ কমেছে ও চরাঞ্চলও বাজেট কাঠামোয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
উপখাতভিত্তিক বিশ্লেষণে জলবায়ু অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাসে বরাদ্দ বেড়ে তিন হাজার ১৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট (এফএসএম) খাতে বরাদ্দ এক হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৯০৪ কোটি টাকা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বরাদ্দ ৯১৬ কোটি টাকা থেকে এক হাজার ৩৩৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
তবে হাইজিন খাত এখনো পৃথক বাজেট লাইনের আওতায় আসেনি। নীতি সংক্ষিপ্তে হাইজিন প্রচার ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য আলাদা ও দৃশ্যমান বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে গ্রামীণ ওয়াশ অর্থায়ন বৃদ্ধি, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য পৃথক অর্থায়ন উইন্ডো, ফিক্যাল স্লাজ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবারের জন্য ওয়াশ নগদ সহায়তা চালু, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালীকরণ, স্কুল ওয়াশ ব্লক সম্প্রসারণ ও হাইজিনকে পুনরায় অর্থায়ন অগ্রাধিকারে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বরাদ্দ এক জিনিস, আর বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার আরেক জিনিস। মনিটরিং, তথ্য ও ওয়াশের জন্য আলাদা বাজেট কোড ছাড়া জবাবদিহিতা দুর্বল থেকে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বড় ওয়াশ প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও নজর দিতে হবে।’
মূল কৌশলগত সুপারিশ
উল্লিখিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস বাজেট চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের আগে নিম্নোক্ত জরুরি নীতি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে:
১. গ্রামীণ ওয়াশ অর্থায়ন শক্তিশালী করা: গ্রামীণ ওয়াশ সেবা প্রদানের জন্য, বিশেষত ডিপিএইচই ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে দরিদ্র গ্রামীণ পরিবার ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পায়।
২. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াশ অর্থায়নের পৃথক উইন্ডো গঠন: উপকূলীয় অঞ্চল, চর, হাওর, পার্বত্য এলাকা ও খরা-প্রবণ অঞ্চলের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়ন লাইন সংরক্ষণ করতে হবে।
৩. ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো: বিশেষত দ্রুত নগরায়ণশীল এলাকায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় এফএসএম, শোধনাগার সুবিধা এবং বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন বাড়াতে হবে।
৪. ওয়াশ নগদ সহায়তা চালু করা: ফ্যামিলি কার্ড বা হেলথ কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিদরিদ্র পরিবারকে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক, টিউবওয়েল, মৌলিক ল্যাট্রিন উন্নয়ন ও পিট ব্যবস্থাপনার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।
৫. স্থানীয় সরকার, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদকে সক্ষম করা: পানির উৎস, স্যানিটেশন সুবিধা ও জলবায়ু-সহনশীল কমিউনিটি ব্যবস্থাসহ ওয়াশ অবকাঠামো পরিকল্পনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনগত ও আর্থিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে।
৬. স্কুল ওয়াশ ব্লক সম্প্রসারণ: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-বান্ধব টয়লেট, ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির সুবিধার জন্য পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।
৭. খাল খননকে সারফেস ওয়াটার পুনরুদ্ধারে রূপান্তর: সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের মতো উচ্চ লবণাক্ততা অঞ্চলে, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমশ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, প্রচলিত খাল খননধর্মী জনকাজকে জলবায়ু-সহনশীল সারফেস ওয়াটার পুনরুদ্ধার ব্যবস্থায় উন্নীত করতে হবে।
৮. হাইজিনকে ওয়াশ অর্থায়ন এজেন্ডায় ফিরিয়ে আনা: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নীতি অগ্রাধিকার উন্নত করতে হাইজিন প্রচার ও আচরণ পরিবর্তনের জন্য পৃথক ও দৃশ্যমান বাজেট লাইন চালু করতে হবে এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বরাদ্দ আলাদাভাবে ট্র্যাক করতে হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ওয়াশ খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নেটওয়ার্ক, নাগরিক সমাজ সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।