বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিমানবন্দর সেবায় নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা, জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাকে আধুনিকায়ন, বিমান চলাচল অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও দেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু সমস্যা সমাধান করছি না; বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে একটি নতুন সেবাসংস্কৃতি গড়ে তুলছি।’ এ সময় তিনি দেশের বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের বিস্তৃত পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘লাগেজ ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা এবং ইমিগ্রেশন সেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এসব সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে শৃঙ্খলা ও সেবার মানোন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’
তিনি জানান, দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছেন।
লাগেজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিজিল্যান্স টিম, বডি-ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি নজরদারি ও ব্যাগেজ রিকনসিলিয়েশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি লাগেজ সরবরাহের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আফরোজা খানম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, আধুনিক গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি, অতিরিক্ত জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত, নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব সংস্কার বৃহত্তর একটি সরকারি পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করা। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছি।’
তিনি জানান, এ কৌশলের আওতায় আন্তর্জাতিক আকাশপথে সংযোগ সম্প্রসারণ, বিমান বহর আধুনিকায়ন, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং বিশ্বমানের বিমানবন্দর অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমান খাত সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘বিমানের বহরে নতুন ২৪টি উড়োজাহাজ সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ থাকবে। ধাপে ধাপে এগুলো যুক্ত করে বিমানকে আধুনিক মিশ্র বহরের (মিক্সড ফ্লিট) একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসে রূপান্তর করা হবে।’
তিনি জানান, পাশাপাশি চলতি বছর পাঁচটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান লিজের মাধ্যমে উড়োজাহাজ সরবরাহে আবেদন জমা দিয়েছে।
আফরোজা খানম বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু বহর বাড়ানো নয়; জ্বালানি-সাশ্রয়ী, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম একটি জাতীয় বিমান সংস্থা গড়ে তোলা।’
মন্ত্রী জানান, উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনসূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আফরোজা খানম বলেন, ‘সরকার সুশাসন, ব্যবসায়িক কৌশল ও সেবার রূপান্তর, এই তিনটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’
তিনি জানান, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, জবাবদিহিতা ও সুশাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান রুটগুলোর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পুনর্মূল্যায়ন করে লাভজনক রুটগুলো আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বাংলাদেশের উপস্থিতি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় নতুন গন্তব্য চালুর বিষয়েও বিমান কাজ করছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট, বাংলাদেশের পতাকা যেন আরও বেশি আন্তর্জাতিক আকাশপথে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে ওড়ে। দেশের বিমান পরিবহন খাতে রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘তৃতীয় টার্মিনাল শুধু আরেকটি টার্মিনাল নয়; এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি। দেশের বিমান চলাচল খাতকে আধুনিক আঞ্চলিক হাবে পরিণত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
সরকার বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বাহরাইন, মালে, জাকার্তা, সিউল, সিডনি, কুনমিং ও নিউইয়র্কসহ নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে।
তবে এসব রুট চালুর সিদ্ধান্ত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বাজারের চাহিদা, দ্বিপক্ষীয় আকাশ পরিবহন চুক্তি ও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে বলে জানান তিনি।
বিমান পরিবহনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতেও সরকার বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বলে জানান আফরোজা খানম।
তিনি বলেন, ‘এ কৌশলের মূল ভিত্তি হচ্ছে বাংলাদেশের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং, পর্যটকবান্ধব ভ্রমণব্যবস্থা এবং পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার মানোন্নয়ন।’
ভিসা নীতিমালা-২০২৬-এর আওতায় সরকার ভিসা প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এবং ধাপে ধাপে ই-ভিসা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এ নীতিমালায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের জন্য মেডিকেল ট্যুরিজম (এমটি) ভিসা, রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের জন্য মেডিকেল অ্যাটেনড্যান্ট (এমএ) ভিসা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আগত বিদেশি পর্যটকদের জন্য রিলিজিয়াস ট্যুরিস্ট (আরটি) ভিসা চালুরও প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া সরকার ইকো-ট্যুরিজম, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন, জলভিত্তিক পর্যটন, রন্ধনশৈলীভিত্তিক পর্যটন এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের মতো বিশেষায়িত পর্যটন খাত সম্প্রসারণে কাজ করছে।
আফরোজা খানম বলেন, ‘বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে সরকার ডিজিটাল প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রামাণ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও, রিলস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক কনটেন্ট নির্মাতা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটন খাতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা, বিধিবিধান সহজীকরণ, কর-সুবিধা, সহজ অর্থায়ন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে নিরাপদ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমান পরিবহন ও পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করাই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।’
আফরোজা খানম বলেন, ‘বিমান পরিবহন খাতে আমরা বিশ্বমানের বিমানবন্দর, উন্নত যাত্রীসেবা এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তুলতে চাই। আর পর্যটন খাতে আমাদের অগ্রাধিকার হলো টেকসই অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল সেবা, বহুমুখী পর্যটন পণ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যেই মানুষ দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, বিমানবন্দরের সেবার মানোন্নয়ন, বিভিন্ন সেবার ব্যাপক ডিজিটালাইজেশন, ভিসা নীতিমালা-২০২৬ বাস্তবায়নে অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক পর্যটনে বাংলাদেশের শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ও পর্যটন অবকাঠামোয় অধিক বিনিয়োগ।’