বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে যখন কোনো পরাশক্তি হঠাৎ করেই রণমূর্তি ধারণ করে, তখন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের চোখ কেবল কামানের গোলার দিকে থাকে না, বরং সেই ধোঁয়ার আড়ালে কী লুকানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেদিকেও থাকে। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং হঠাৎ করে শুরু হওয়া এই বিধ্বংসী যুদ্ধ আসলে কোনো একক সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম নোংরা এবং ভয়ঙ্কর একটি অভ্যন্তরীণ কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা। এই কেলেঙ্কারির নাম—জেফরি এপস্টাইন ফাইলস। ২৬ বছরের সাংবাদিকতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির নির্যাস নিয়ে যখন আমি এই ঘটনাটিকে ব্যবচ্ছেদ করি, তখন দেখি ট্রাম্পের প্রতিটি মিসাইল হামলার পেছনে আসলে রয়েছে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক করুণ লড়াই।
জেফরি এপস্টাইন ফাইলস আমেরিকার জন্য কেবল একটি যৌন কেলেঙ্কারি নয়, এটি ছিল মার্কিন এলিট শ্রেণির—যাদের আমরা রাঘব বোয়াল (এলিট) রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী ধনকুবের বলি—তাদের জন্য এক মহাপ্রলয়ঙ্কারী বজ্রপাত। প্রতিদিন যখন একের পর এক ফাইলবোমা মার্কিন ক্ষমতার অলিন্দে বিস্ফোরিত হচ্ছিল, তখন সেই এলিটদের জন্য বাঁচার কোনো পথ খোলা ছিল না। ঠিক এই মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা বিনা উসকানিতেই ইরানের ওপর হামলার তোড়জোড় শুরু করেন। আলোচনার টেবিল থেকে একতরফাভাবে উঠে গিয়ে তিনি যখন সরাসরি যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন, তখন বিশ্ববাসী অবাক হলেও রাজনীতির ভেতরের মানুষরা জানতেন—এই যুদ্ধের মূল টার্গেট তেহরান নয়, বরং ফ্লোরিডার সেই পাম বিচে লুকিয়ে থাকা এপস্টাইনের কুখ্যাত ডায়েরির পাতাগুলো।
ওয়াশিংটন পোস্ট এবং গার্ডিয়ানের মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এপস্টাইন ফাইলসের নতুন কিস্তি ফাঁস হওয়ার পর মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তা থেকে জনমানুষের দৃষ্টি সরাতেই ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এই হার্ডলাইন বা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় 'র্যালি রাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ ইফেক্ট'। অর্থাৎ, যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অভ্যন্তরীণভাবে চরম সংকটে পড়েন, তখন তিনি কৃত্রিমভাবে একটি বহিঃশত্রু তৈরি করেন এবং যুদ্ধের উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন। এতে করে দেশের মানুষ ভেতরের দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারি ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের জোয়ারে ভেসে যায় এবং পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। ট্রাম্পের জন্য এই মুহূর্তে ইরানের চেয়ে বড় কোনো 'ডিস্ট্রাকশন' বা মনোযোগ সরানোর হাতিয়ার আর ছিল না।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে চলে আসে—ডোনাল্ড ট্রাম্প কি নিজেও এপস্টাইন ফাইলসে একজন অপরাধী? মার্কিন আইন বিভাগ এবং তদন্তকারী সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে আসছে, তা ভয়াবহ। ট্রাম্প এবং জেফরি এপস্টাইনের সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ফ্লোরিডার পার্টিগুলোতে তাদের উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের নিজের মুখেই এপস্টাইনকে 'টেরিফিক গাই' বা ভীষণ চমৎকার মানুষ হিসেবে অভিহিত করা আজ বুমেরাং হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে। নতুন ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যাচ্ছে, এপস্টাইনের সেই কুখ্যাত দ্বীপে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের তালিকায় ট্রাম্পের নাম বারবার উঁকি দিচ্ছে।
যদিও মিস্টার ট্রাম্প বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু ফাইলগুলোতে থাকা তথ্যপ্রমাণ বলছে অন্য কথা। যদি এই ফাইলগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে জনসম্মুখে চলে আসে, তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কেবল শেষই হবে না, বরং তাঁকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই এই ‘ফাইলবোমা’ থেকে নিজেকে বাঁচাতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আসল বোমা ফেলার কৌশল বেছে নিয়েছেন।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের অত্যন্ত পুরোনো এবং কার্যকর একটি টেকনিক বা কৌশল। ১৯৯৮ সালে যখন মনিকা লিউয়িনস্কি কেলেঙ্কারির উত্তাপে বিল ক্লিনটনের গদি টলমল করছিল, ঠিক তখন তিনিও সুদান ও আফগানিস্তানে ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়েছিলেন। একইভাবে ইরাক যুদ্ধের সময় বুশ প্রশাসনও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিল। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প সেই একই পুরোনো ড্রামাটিক স্ক্রিপ্ট বা নাটকীয় পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করছেন। ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত আসলে মার্কিন জনতাকে এক ধরনের ট্রমার মধ্যে রাখা, যাতে তারা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এপস্টাইনের নথিতে ট্রাম্পের নাম না খুঁজে বরং সিএনএন-এর স্ক্রিনে ইরানের ওপর মিসাইল হামলার দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে আর বলে উঠে, আমাদের আমেরিকা মহান!
আল-জাজিরা এবং মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক কঠিন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের অভাবনীয় সামরিক সামর্থ্যের দাপট দেখাচ্ছে, তারা হয়তো আধুনিক ড্রোন দিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে সশরীরে সরিয়ে দিতে পেরেছে, কিন্তু তারা একটি ধ্রুব সত্য ভুলে যাচ্ছে—আয়াতুল্লাহ খামেনি কেবল একজন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধান নন, তিনি একটি শিয়া-বিপ্লবী মতাদর্শের প্রাণপুরুষ। খামেনিকে হত্যা করে হয়তো তাঁর শরীরকে নিথর করা গেছে, কিন্তু যে আদর্শ তিনি কোটি মানুষের মনে বুনে দিয়েছেন, তা বোমাবর্ষণ করে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। ইরান এমন এক জাতি, যাদের রক্তে বইছে হাজার বছরের আত্মমর্যাদার ইতিহাস। তারা হয়তো যুদ্ধে মাটির নিচে মিশে যাবে, তাদের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তারা কখনোই মার্কিন আধিপত্যের কাছে বশ্যতা স্বীকার করবে না।
ইরান, ইরাক, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়াজুড়ে খামেনির যে মিলিয়ন মিলিয়ন অনুসারী রয়েছে, তারা এই লড়াইকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে দেখছে না। তাদের কাছে এটি একটি 'ধর্মীয় ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই'। ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে, ড্রোন বা আধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে ব্যক্তিকে সরানো সহজ, কিন্তু কয়েক দশকের শিকড় গাড়া একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আইডিওলজি বা মতাদর্শকে মুছে ফেলা অসম্ভব। ট্রাম্পের এই হামলা আসলে ওই অঞ্চলে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করেছে, যা দশকের পর দশক ধরে আমেরিকাকে ভুগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাশুল দিচ্ছে সারা বিশ্ব। রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গের মতো অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বলছে, পারস্য উপসাগরে এই উত্তেজনার ফলে তেলের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দাবি করে, কিন্তু গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলে যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন লজিস্টিকস এবং উৎপাদন খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আজ মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশনের কবলে পড়েছে। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদি 'স্ট্যাগফ্লেশন'-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে কিন্তু পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে আজ কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি, ঢাকার রাজনীতির কারণে।
ইউরোপীয় মিত্রদের ওপরও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে ভয়াবহভাবে। ন্যাটো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ওপর প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য মার্কিন চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এটি একটি অসম্ভব এবং অযৌক্তিক দাবি। যুক্তরাজ্য যদি তাদের প্রতিরক্ষা খরচ এভাবে বাড়াতে চায়, তবে তাদের জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে, বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত এনএইচএস বা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের বাজেট মারাত্মকভাবে কাটছাঁট করতে হবে। ব্রিটিশ জনগণ ইতোমধ্যেই রাজপথে নেমেছে এর প্রতিবাদে। এনএইচএস-এর মতো একটি মানবিক খাতকে ধ্বংস করে সেই টাকা দিয়ে মারণাস্ত্র কেনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু পর্দার আড়ালের ‘লবি গ্রুপ’ বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো চায় এনএইচএস-এর বেসরকারিকরণ বা প্রাইভেটাইজেশন ঘটাতে। তারা এই যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে জনস্বাস্থ্যের টাকাকে সমরাস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢোকাতে চাইছে।
সব মিলিয়ে এটি এক অদ্ভুত এবং নিষ্ঠুর পরিহাস। ২০ বছর আগের এক জেফরি এপস্টাইনের ব্যক্তিগত পঙ্কিলতা আর কেলেঙ্কারির নথি ধামাচাপা দেওয়ার ঘৃণ্য রাজনীতির মাশুল আজ দিচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। একদিকে বিশ্বনেতারা তাত্ত্বিক গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বুলি আওড়াচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থে হাজার হাজার মাইল দূরে নিরপরাধ মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ইরান অভিযান আসলে কোনো বীরত্ব নয়, বরং এটি একজন রাজনৈতিক অপরাধীর নিজেকে আড়াল করার শেষ চেষ্টা।
ভবিষ্যতে যখন এই সময়কাল নিয়ে ইতিহাসের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ হবে, তখন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে এক করুণ চিত্র—কীভাবে গুটিকতক ক্ষমতাবানের ব্যক্তিগত লালসা আর নোংরা কেলেঙ্কারি ঢাকতে গিয়ে একটি গোটা সভ্যতাকে যুদ্ধের লেলিহান শিখায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। জেফরি এপস্টাইনের সেই পঙ্কিল নথিগুলো আজ আর কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কোনো ফাইল নয়, বরং তা এক বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার কী চরম পরিহাস, আজ এপস্টাইনের মতো একজন জঘন্য অপরাধীর ব্যক্তিগত পাপের দায় মেটাতে হচ্ছে ইরানসহ বিশ্বের কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে, যারা হয়তো এই কুখ্যাত নামটির সাথেও কোনোদিন পরিচিত ছিল না!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট
ই-মেইল: [email protected]