মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির ভূরাজনীতিতে যখন ইরান একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর বার্তা দিচ্ছে, তখন একটি নাম বারবার ফিরে আসে, তিনি হলেন হাসান তেহরানি মোকাদ্দাম। আজ ইরানের যে দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা, যে প্রতিরোধ শক্তি আঞ্চলিক রাজনীতিকে নতুন সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে, তার পেছনে এই মানুষটির অবদান এতটাই গভীর যে তাকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইরানের সামরিক ইতিহাস লেখা প্রায় অসম্ভব।
আজ ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে দফায় দফায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক হামলায় ইরান দেখিয়েছে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করার সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হয়েছে।
এই সামরিক শক্তির ভিত গড়ে দিয়েছিলেন যে মানুষটি, তিনি ছিলেন হাসান তেহরানি মোকাদ্দাম। আমেরিকা-ইসরায়েলের বুকে কাঁপন ধরানো এই মানুষটি নেই, কিন্তু তার তৈরি করা প্রযুক্তি দিয়েই ইরান আজ শত্রুর বিরুদ্ধে মাথা উচু করে লড়াই করে চলেছে।
হাসান তেহরানি মোকাদ্দামের জীবনকে কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তার জীবন আসলে একটি রাষ্ট্রের সামরিক আত্মরক্ষার দর্শনের বিবর্তনের গল্প।
১৯৮৯-র ইরানি বিপ্লবের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে লড়াই করছে, তখন তরুণ মোকাদ্দাম ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, শুধু প্রচলিত অস্ত্র বা স্থলযুদ্ধ দিয়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এই উপলব্ধির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র তৈরি হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়।
আট বছরের সেই যুদ্ধ ইরানকে শিখিয়ে দেয়, যে রাষ্ট্র আকাশে দুর্বল, সে যদি দূরপাল্লায় পাল্টা আঘাত হানতে না পারে, তবে তার বড় শহরগুলো সবসময় শত্রুর হামলার মুখে থাকবে। সেই যুদ্ধের সময় ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরানসহ একাধিক শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এই বাস্তবতা মোকাদ্দামের চিন্তায় গভীর ছাপ ফেলে।
মোকাদ্দাম উপলব্ধি করেন, আকাশে শক্তির সমতা না থাকলেও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের মাধ্যমে শত্রুর সঙ্গে কৌশলগত সমতা তৈরি করা সম্ভব। চোখে চোখ রেখে কথা বলা সম্ভব। এই ধারণাই পরে ইরানের প্রতিরোধনীতির ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মোকাদ্দামের নেতৃত্বে ইরান ধীরে ধীরে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে। শুরুতে সীমিত সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও পরে তা দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
হাসান মোকাদ্দামের সমরনীতির মূল দর্শন ছিল খুব স্পষ্ট: শত্রুকে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, তার ভৌগোলিক অবস্থানের দূরত্ব স্বত্তেও ভয় দেখাতে হবে। এই নীতির ফলে ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে যা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
আজ ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে যে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে, সেটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়; বরং বহু দশকের সামরিক পরিকল্পনার ফল। এই পরিকল্পনার স্থপতি ছিলেন মোকাদ্দাম।
ইরানের বর্তমান সামরিক অবস্থান বোঝার জন্য একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেটি কেবল অস্ত্রের শক্তি নয়, ইরানের মানসিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়ার শক্তিও। আজ যখন আমেরিকা ও ইসরায়েলের চোখ রাঙানি কিংবা আল্টিমেটাম উপেক্ষা করে ইরান ক্ষেপনাস্ত্র-বৃষ্টি নামায় ইসরায়েলের আকাশে, তখন বিশ্ব অবাক চেয়ে রয়। আর এই ক্ষেপনাস্ত্র-বৃষ্টি শুধু স্থাপনা ধ্বংস করা নয়, প্রতিপক্ষকে তেহরানের সক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়া।
সাম্প্রতিক সংঘাতে দেখা গেছে, ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বারবার বেজে উঠছে, মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হচ্ছে, এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টানা সক্রিয় রাখতে হচ্ছে। এতে করে অনেক সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে।
এই ধরনের বহুস্তরীয় চাপ তৈরি করার ধারণা মোকাদ্দামের সামরিক চিন্তারই ফসল। তিনি বুঝতেন, যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদের নয়, প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপও উপহার দেওয়া।
তার মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা।
২০১১ সালের নভেম্বরে তেহরানের পশ্চিমে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন। ইরান এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এটি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না; বরং আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত নাশকতা ছিল সেটি। যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ সামনে আসেনি, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—তার মৃত্যুর পরও যে কর্মসূচি তিনি গড়ে গিয়েছিলেন, তা থেমে যায়নি। বরং তেহরানের ক্ষেপনাস্ত্র কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এটাই তার উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আজ ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দিচ্ছে, তখন প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পেছনে মোকাদ্দামের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক দর্শনের সাফল্যই যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মোকাদ্দাম ইরানকে শিখিয়েছিলেন, প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টিকে থাকার উপায় হলো অসম যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করা। অর্থাৎ, যেখানে সরাসরি শক্তির সমতা নেই, সেখানে দূরপাল্লার আঘাত, বারবার আক্রমণ, বিরোধীপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলা এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি। সব মিলিয়ে এক নতুন যুদ্ধনীতিকে শক্তিশালী করে তোলা। ইরানের আজকের বাস্তবতায় সেটিই দেখা যাচ্ছে।
পারস্যের ইতিহাস তার সন্তানদের বীরত্ব ভোলেনি। সাইরাস বা দানিয়ুসের মতো হাসান তেহরানি মোকাদ্দামের নামও ইরানিদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। যতদিন পারস্য উপসাগরের ঢেউ আছড়ে পড়বে ইরানের উপকূলে, যতদিন তাদের আকাশে সার্বভৌমত্বের পতাকা উড়বে—ততদিন হাসান তেহরানি মোকাদ্দাম বেঁচে থাকবেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে। তিনি কোনো ব্যক্তির নাম নন, তিনি একটি জাতির অপরাজেয় প্রতিরোধের নাম।
লেখক: লুৎফর রহমান হিমেল
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]