বিশ্লেষণ
এবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতায় আসলো, হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি। ফলাফলে দেখা যায় দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা, তৃণমূল কংগ্রেসকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে, ভূমিধস বিজয় লাভ করেছে দলটি। যার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও ভোটার তালিকায় ব্যাপক সংশোধন, এই নির্বাচনে বিজেপিকে অভূতপূর্ব এই সাফল্য এনে দিয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর-পরই ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ঢালাওভাবে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বদলি করেছে।
এ ছাড়া, নির্বাচন কমিশন পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায়, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি, যার মধ্যে মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটার ছাড়াও রয়েছেন, কোনো কারণ ছাড়াই বাড় পড়া অন্তত ৩০ লাখ ভোটার। এই বিষয়টি বিজেপিকে একটি সুযোগ করে দিয়েছে বলে, মনে করা হচ্ছে। এত কিছুর মধ্যেও, যে বিষয়টি নজরকাড়ে, তা হলো রাজ্যটির বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে, বিজেপির বিপুল বিজয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের, ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। এরমধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেয়া হলেও ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্তে কোনো কাঁটাতার নেই। সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার, ৪৪টি আসন বাংলাদেশ সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। এসব আসন মূলত রাজ্যটির কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত।
জনসংখ্যা ও ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এসব অঞ্চলের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই মুসলিম। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ভোটার তালিকায় সবচেয়ে বেশি বাদ পড়েছে এসব অঞ্চলের ভোটারদের নাম, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের।
সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ৪৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি পায় ১৭টি ও তৃণমূল পেয়েছিল ২৭টি। গত নির্বাচনে তৃণমূলের ৪৩ জন মুসলিম বিধায়কের মধ্যে, ১২ জন সীমান্তবর্তী আসনে জয়লাভ করেছেন। এবারের নির্বাচনে এসব আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২৮টি, তৃণমূল ১৫টি এবং কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ১টি। যার মধ্যে ১৭টি আসন বিজেপি ধরে রেখেছে এবং ১১টি আসনে নতুন করে বিজয় অর্জন করেছে। অন্যদিকে তৃণমূল ১৫টি ধরে রাখলেও, নতুন একটি আসনও জিততে পারেনি। তৃণমূলের সীমান্তবর্তী ১৫টি আসনের ১০টিতে জিতেছেন মুসলিম প্রার্থীরা এবং কংগ্রেসের একটিমাত্র আসনের বিধায়ক মুসলিম। অন্যদিকে এবারে বিধানসভার কোনো আসনেই, মুসলিম প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিজেপি।
এর আগে, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলেন, ‘এবারের ভোটে অনেক জেলায় তৃণমূল খাতা খুলতে পারবে না।’ নির্বাচনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, রাজ্যের ৯টি জেলায় তৃণমূল কোনো আসনই পায়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, রাজ্যের ১৮৭টি আসনে যেখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম, তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ১১৯টি আসনেই জয়ী হয়েছে বিজেপি।
এই ১৮৭টি আসনের মধ্যে অন্তত ৪৭টি আসনে, জয়ের ব্যবধানের চেয়ে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল, অনেক বেশি। অর্থাৎ, ওই ভোটারদের নাম বাদ না পড়লে, এই আসনগুলোর ফলাফল অন্যরকম হতে পারত বলে, মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিজেপির জয়ী হওয়া ২৮টি আসনে, জয়ের ব্যবধান, বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম। এই ২৮টি আসনের মধ্যে ২৬টিতেই, ২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। এর মধ্যে জঙ্গিপুর, রতুয়া, করণদিঘি; এই তিনটি আসনেই, জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি এবং এই প্রতিটি আসনেই ২০২১-এর বিজয়ী তৃণমূলকে হারিয়েছে বিজেপি।
মনে করা হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারণায় হিন্দুত্ববাদ ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিজেপির কঠোর বার্তা পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বিজেপির পক্ষে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। এ ছাড়া তৃণমূল শাসনের ১৫ বছরের শাসনে তাদের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে তার বিরুদ্ধেও বিজেপির পক্ষে ভোট দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটাররা।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির বিজয় ভারতের নথিপত্রহীন নাগরিকদের পুশ-ইন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের সমাবেশে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ জানিয়েছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করে দেয়া হবে এবং কোনো অনুপ্রবেশকারীকে রাজ্যে থাকতে দেওয়া হবে না। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের বুলডোজার দিয়ে সাফ করা হবে বলে প্রকাশেই হুমকি দিয়েছেন।
ফলে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনুপ্রবেশকে, ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে বিজেপি নেতারা। এমন অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির বিজয় ভারতের বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপ্রবেশকারী ঠেকানো এবং বাংলাদেশে পুশ-ইন করার রাজনীতিকে আরও হাওয়া দেবে। পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের, বাংলাদেশি হিসেবে কাটাতারের এপারে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কাও, প্রবল হয়ে উঠেছে অনেকের মনে। এর ওপর সিএএ ও এনআরসি বাস্তবায়ন করা হলে, এই ঢেউ আরও বাড়তে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ১১২ কিলোমিটার অংশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। তৃণমূল সরকার এই অংশটিকে বরাবরই উপেক্ষা করে গেছে। ফলে বিজেপি সরকারের আমলে এটিও অগ্রাধিকার পাবে।
সমালোচকরা বলছেন, রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে, এতদিন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে, রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা সহজ হবে।
বিজেপিও বরাবর বলে আসছে, তারা ক্ষমতায় আসলে, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হবে এবং ফেরত পাঠানো হবে। সীমান্ত সমস্যা ছাড়াও অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশে ভারত ঘনিষ্ঠ হাসিনা সরকারের পতন সীমান্তবর্তী আসনসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে বিজেপি নেতারা বাংলাদেশের নির্বাচনে, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সাফল্যকে হিন্দুদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখিয়ে, এবারের নির্বাচনে হিন্দু ভোটকে একজোট করতে সাফল্য লাভ করেন।