‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ দেশের ৫০১তম উপজেলা হিসেবে সরকারিভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে এই উপজেলা হঠাৎ করেই গঠিত হয়নি, এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের দীর্ঘ জনদাবি, প্রশাসনিক অবহেলা এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
ভৌগোলিক বিশালত্ব ও প্রশাসনিক দূরত্ব প্রধান কারণ
ফটিকছড়ি ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উপজেলা, যার আয়তন প্রায় ৭৭৩.৫৫ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের এই বিশালত্বের কারণেই মূলত একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে পুরো অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
বিশাল দূরত্ব: ফটিকছড়ি সদরের (বিবিরহাট) অবস্থান ছিল উপজেলার দক্ষিণে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের বাগানবাজার বা দাঁতমারা ইউনিয়নের দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার।
যাতায়াত দুর্ভোগ: প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে একটি সাধারণ সরকারি সেবা, জমির পর্চা বা প্রশাসনিক কাজের জন্য পুরো দিন ব্যয় করে এবং বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে সদরে যাতায়াত করতে হতো। বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগই মূলত আলাদা উপজেলা দাবির মূল ভিত্তি তৈরি করে।
‘ভুজপুর থানা’ গঠন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রথম ধাপ
উত্তর ফটিকছড়ির সর্ব দক্ষিণের এই ইউনিয়নে থানার সদর দপ্তর করা ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ১/১১ জরুরি সরকারের এক মেজর জেনারেল তার শ্বশুর বাড়ির কাছে থানা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ২০০৭ সালের ২১ জুলাই জনবিরোধী এই থানার কার্যক্রম শুরু করেন। তখন মানুষ এর বিরোধিতা করলেও উপজেলা গঠনের সময় জনদাবি মেনে নেওয়া হবে এই আশ্বাসে গত ১৯ বছর অপেক্ষা করে। কিন্তু বিএনপির মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের সময় ১/১১ মঈনউদ্দিন আর ফকরুদ্দিন সরকারের অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে—মানুষ তা বিশ্বাস করতে পারেনি। অভিযোগ আছে এক ঋণখেলাপি বিএনপি সংসদ সদস্য ৫ মাসে কোর্টের বারান্দায় বসে এই জনবিরোধী ঘটনা ঘটান কয়েকজন জমির ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে।
বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভুজপুর, হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল—এই ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘ভুজপুর থানা’ গঠিত হয়। থানা গঠিত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় মানুষের মনে এই প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, নতুন উপজেলা গঠনের আগে সবার সাথে সমন্বয় করে যৌক্তিক স্থানে নতুন উপজেলার সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে। জানা গেছে, ২০০৯ সালে এই সংক্রান্ত একটা চিঠি দিয়ে সেই সময়ের ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কেবিনেটে চিঠি দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা বাস্তবায়ন করেনি। ‘ভুজপুর উপজেলা’ বা পরবর্তীকালে সংশোধিত রূপ ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ গঠনের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা সুসংগঠিতভাবে আন্দোলন শুরু করেন।
দীর্ঘদিনের চরম উন্নয়ন বৈষম্য
ফটিকছড়ির দক্ষিণাঞ্চল যতটা উন্নত ও অবকাঠামোগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ততটাই অবহেলিত ও উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। এলাকার বিশাল চা বাগান ও রাবার বাগান থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জিত হলেও, স্থানীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সড়কের আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করতেন, আলাদা বাজেট ও নিজস্ব উপজেলা প্রশাসন না থাকলে এই দুর্গম অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়। মূলত এই ক্ষোভ থেকেই স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বিভিন্ন সময়ে আলাদা উপজেলার জোরালো দাবি ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়ের পটভূমি ও সরকারি অনুমোদন
দীর্ঘ আন্দোলনের পর অবশেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ফটিকছড়িকে ভেঙে নতুন উপজেলা গঠনের প্রাথমিক প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর আগে প্রতিটি ইউনিয়নে গণশুনানি করে স্থানীয় প্রশাসন এবং সুনির্দিষ্ট কোথায় সদর দপ্তর হবে সেটা সুপারিশ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, ২০২৬ সালের ৮ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ৫০১তম উপজেলা হিসেবে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ গঠনের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সদর দপ্তর পাল্টে দেওয়া হয় এবং সর্ব দক্ষিণের সুয়াবিল ইউনিয়ন যেটা বাদ দেওয়ার কথা ছিল সেটাও রেখে দেওয়া হয়! ফলে বড় ধরনের অসন্তোষ শুরু হয়।
বর্তমান অসন্তোষের জায়গা ও নতুন মোড়
উপজেলা গঠন হলেও আন্দোলনের ধরন ও প্রেক্ষাপট এখন ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সুয়াবিল ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সুয়াবিল ইউনিয়নের মানুষের অভিযোগ, তাদের ইউনিয়নটি ফটিকছড়ি সদর (বিবিরহাট) থেকে মাত্র ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু নতুন গঠিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা সদরের দূরত্ব তাদের ওখান থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার। তাই সুয়াবিলবাসী এখন এই নতুন উপজেলা থেকে বাদ পড়ে পূর্বের ফটিকছড়িতেই থাকার জোর দাবি জানাচ্ছে এবং এটি নিয়ে আদালতে একাধিক রিটও করা হয়েছে।
সদর দপ্তর নিয়ে দ্বন্দ্ব: গেজেটে সদর দপ্তর ভুজপুরের ‘পশ্চিম ভুজপুর মৌজায়’ নির্ধারণ করায় বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাটের মানুষ ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি—সবার জন্য ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক মধ্যবর্তী স্থান ‘জুজখোলা মৌজা’-তে সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হোক যেটা গন শুনানীর মাধ্যমে স্থির করা হয়েছিল।
ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক দূরত্ব কমিয়ে সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করা। তবে নতুন সীমানা নির্ধারণ ও সদর দপ্তরের স্থান নির্বাচন নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষের কারণে দীর্ঘদিনের এই কাঙ্ক্ষিত অর্জনটি এখন নতুন এক সংকটে রূপ নিয়েছে।
সদ্য-ঘোষিত দেশের ৫০১তম উপজেলা ‘ফটিকছড়ি উত্তর’-এর সদর দপ্তর বা কার্যালয় স্থাপন নিয়ে ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর বিশেষ করে বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাট দক্ষিণের ১০টি ইউনিয়নের সমান। বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারি গেজেটে সদর দপ্তর ভুজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ভুজপুর মৌজায় নির্ধারণ করা হলেও আন্দোলনকারীদের দাবি—ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং যাতায়াতের সুগমতার কথা বিবেচনা করে সদর দপ্তরটি স্থাপন করা হোক নারায়ণঘাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী জুজখোলা মৌজায়।
চলমান পরিস্থিতি এবং আন্দোলনের মুখে যদি যৌক্তিক সমাধান না হয় তাহলে এখানে ভয়াবহ হানাহানির আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলন কেবল মৌখিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন একটি সুসংগঠিত রূপ নিয়েছে। ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে।
হরতাল ও সড়ক অবরোধ: দাবির সপক্ষে ইতোমধ্যে ঢাকা-ফেনী-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ফটিকছড়ি-ফেনী-হেয়াকো সড়কে বড় ধরনের অবরোধ হয়েছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই (বৃহস্পতিবার) দাঁতমারা, বাগানবাজার ও নারায়ণগঞ্জহাট ইউনিয়নে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়েছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে দাবি উত্থাপন: গত ১১ জুলাই ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে স্থানীয় সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলন করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে পারে?
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ইতিহাস এবং বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে এই সংকটের সমাধান মূলত তিনটি পথে হতে পারে:
১. উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত ও সীমানা পুনর্বিবেচনা
২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন কর্তৃক যে গণশুনানি করা হয়েছিল, সেখানে স্থানীয়দের সুবিধার কথা চিন্তা করে নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী স্থানটিকে যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা পরিবর্তিত হয়ে পশ্চিম ভুজপুর কীভাবে হলো তা রহস্যজনক। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য গোপনে কিছু জমি ব্যবসায়ীর যোগসাজশে কাউকে না জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় মন্ত্রী সংসদ সদস্যের কথা অনুযায়ী নিকারে এই স্থানকে নির্দিষ্ট করে নতুন উপজেলা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকার মানুষ ফুঁসে ওঠেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে চট্টগ্রামের দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য ফটিকছড়ি সফর করেননি বা আগে থেকে গণশুনানি বিবেচনায় নেননি।
আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। গণদাবির মুখে এবং জনভোগান্তি এড়াতে সরকার ভুজপুরের পরিবর্তে জুজখোলা মৌজায় বা সর্বসাধারণের জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো মধ্যবর্তী স্থানে সদর দপ্তর স্থানান্তরের সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করতে পারে।
২. আইনি লড়াই
যদি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া যায়, তবে আন্দোলনকারীরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
বাংলাদেশের অনেক স্থানেই উপজেলার সীমানা নির্ধারণ বা সদর দপ্তর স্থাপন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। আদালত যদি মনে করেন যে গেজেটটি তৈরির ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিংবা সিংহভাগ জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে, তবে গেজেটের ওপর স্থগিতাদেশ বা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিতে পারেন।
৩. দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব
যদি সরকার তার পূর্বের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে এবং আন্দোলনও অব্যাহত থাকে, তবে তা এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের স্থবিরতা ডেকে আনতে পারে। এমনকি হানাহানির পর্যায়ে চলে যাবে।
মূল কথা হলো ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চলের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় ভুজপুরের অবস্থান প্রান্তিক হয়ে পড়ে—এটি একটি বাস্তবিক সত্য। যেহেতু আন্দোলনটি দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এগিয়ে চলেছে, আবার বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের সুয়াবিল ইউনিয়ন উত্তর উপজেলার অন্তর্গত করার কোনো মানে নেই, তাই সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সমঝোতামূলক তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং অধিকাংশ স্থানীয়দের দাবির সপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
উত্তর ফটিকছড়ি এলাকার মানুষ নতুনভাবে গণশুনানি করে যৌক্তিক স্থানে সদর দপ্তর নির্ধারণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, নতুবা এলাকার একটা স্থায়ী শত্রুতা এবং হানাহানির আশঙ্কা থেকে যাবে।
লেখক
এম জে আবেদীন
সাবেক যুগ্ম সম্পাদক
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি