আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করেন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কে বিজয়ী হবে, আমার সহজ উত্তর হচ্ছে, আমি জানিনা। আমি নিজেকে অর্থনীতি ও ডাটা এনালিসিসে ট্রেইন করেছি। নির্বাচনের মতো কোনো প্রশ্নে যদি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে কথা বলতে হয়, তবে আমার ডাটা লাগবে; কিন্তু এই প্রশ্নে উত্তর দেওয়ার ডাটা আমার হাতে নেই।
আমার কিছু স্পষ্ট ইনসাইট আছে। আমি স্পষ্ট দেখেছি শহুরে মধ্যবিত্তে জামায়াত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল; কিন্তু বিগত কয়েক সপ্তাহের ঘটনায় সেই উত্থান উল্টোমুখি হয়েছে এবং দেশের স্ট্যাবিলিটির জন্য তারা তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোর ফলাফল থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, একটা এজ গ্রুপে জামায়াত প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—যে গ্রুপটিতে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে পাঁচ কোটি। নারী ভোটার জামায়াতকে ভোট দেবে না—এই মিথ ভেঙে পড়েছে। এই সাংঘর্ষিক সিগন্যালগুলোর ওপর দাঁড়ানো সামাজিক বোঝাপড়া দিয়ে আমি কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না।
ফলে আমার ডাটা লাগবে, এবং আমার কাছে তিনটা ডাটা আছে। একটা ইনোভেশন কনসাল্টিং-এর দুইটা সার্ভে। ব্র্যাকের বিআইজিডির দুইটা সার্ভে। এবং এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটের একটা সার্ভে, যেটাতে ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন তারা বিএনপিকে ভোট দেবেন।
এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটের সার্ভে আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ খুব সিম্পল—এমিনেন্সের সার্ভেতে মাত্র ০.২ শতাংশ ব্যক্তি বলেছেন তারা ভোট দেবে না। অর্থাৎ, এমিনেন্স ২০ হাজার উত্তরদাতার মধ্যে মাত্র ৪০ জন বলেছে তারা ভোট দেবে না এইটা অ্যাবসার্ড। কারণ ব্র্যাক ও বিআইজিডি—এই দুইটা প্রতিষ্ঠানের চারটি পালস সার্ভেতে মতামত দেয় নাই বা ভোট দিতে যাবে না—এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ; অর্থাৎ, ২০ হাজারে এইটা প্রায় ১০ হাজার। এবং শুধু ভোট দেবে না বা মতামত নেই—এই ডাটা নয়, বিবিধ প্রশ্নে ব্র্যাক, বিআইজিডি ও ইনোভেশনের ফাইন্ডিং কাছাকাছি।
ইনোভেশনের সার্ভের মেথডলজি তৈরিতে আমরা বন্ধুবান্ধবেরা শলাপরামর্শ দিয়েছি। বিআইজিডির সার্ভের টেকনিক্যাল টিম আমাদের বন্ধুদের নেটওয়ার্কের মধ্যেই। কিন্তু এই দুইটার ডাটা কালেকশন ও এনালিসিস প্রতিষ্ঠান দুইটি ইন্ডিপেনডেন্টভাবে করেছে। এবং এইটাই আমার বিআইজিডি ও ইনোভেশনের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি আস্থা রাখার প্রধান কারণ—যে দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন সার্ভেতে ডাটা কনসিস্টেন্সি খুবই একই। যার অর্থ, এই সার্ভে দুইটার মেথডলজিক্যালি যথেষ্ট দৃঢ়।
ইনোভেশনের সার্ভে আমি এবং তৌকির অনেকভাবে এনালাইজ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এই সার্ভে থেকে আমরা আসনভিত্তিক বিজয়ীর সংখ্যা কোনোভাবেই বলতে পারবো না; কারণ সার্ভেটিতে বাংলাদেশের মোট ৫০ শতাংশ ভোটারের মতামত নেই।
আমার বন্ধুরা কিছু প্রক্সি প্রশ্ন করেছে—যে প্রশ্ন থেকে এই ৫০ শতাংশের মতামত পাওয়া যায়; কিন্তু এই প্রক্সি প্রশ্নের উত্তরগুলো এনালিসিস করে আমি এবং তৌকির বিভিন্ন রকম উত্তর পেয়েছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হয়েছে এই জবাব দিতে অনিচ্ছুক ও ভোট দেবো না—এই উত্তরদাতাদের মধ্যে বড় অংশ জামায়াতকে ভোট দেবে; আবার কোনো কোনো প্রক্সি প্রশ্নে মনে হয়েছে এরা বিএনপির দিকে ঝুঁকে আছে।
ফলে সিচুয়েশনটা এমন যে, প্রাপ্ত ডাটা এনালিসিসের ভিত্তিতে কোনমতেই বলা সম্ভব না—জামায়াত ৭০টা সিট পাবে নাকি ১৭০টা সিট পাবে।
আমার বন্ধুরা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে আরও বিভিন্ন ফিল্ড সার্ভের ডাটা এনালাইজ করে, এবং সেই এনালিসিসে আমরা ক্রমাগত এটা জানতে পারছি যে সমাজে জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি হয়েছে। এবং জামায়াতের তালিম গ্রুপ ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছে, যেখানে বিএনপির এমপিরা মূলত সদরে জনসভা করছে এবং এলাকার পাতি মাস্তানেরা সব বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ভিড় জমিয়েছে, যাদের ঘিরে বিভিন্ন আসনে নেতিবাচক আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইনের কোন ইতিহাস নাই। ফলে তালিম গ্রুপের প্রভাব কি হবে আমরা জানিনা।
আসিফ সাহান সরাসরি মাঠে কাজ করছে। বিআইজিডির হয়ে তার কিছু ইন্টারেস্টিং ইনসাইট আছে, যা আজ তিনি স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন। থিংস লুকিং টাইট।
একই সঙ্গে, বেশ কিছু এনালিসিসের ভিত্তিতে বিএনপি যদি ২২০ প্লাস আসনও পায়, আমি অবাক হবো না। আবার যদি হাং পার্লামেন্ট হয়, বা জামায়াত জিতে আসে—আমি তাও অবাক হবো না। কারণ ক্লিয়ারলি ক্রেডিবল সার্ভেতে ৫০ শতাংশ ভোটার তাদের মত দেয় নাই, বা তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না।
এই অবস্থায় আমাকে যদি কেউ বাজি ধরতে বলেন—কে জিতবে—আমি এজ এ ট্রেইন্ড ইকোনমিস্ট, আমি এক টাকাও বাজি ধরবো না, কারন আমার কাছে সিদ্ধান্ত পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য ডেটা নেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও লেখক। (ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া)