সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতৃত্ব এবং এনসিপি গঠনের অগ্রভাগে থাকা ছয় নারী নেত্রীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জোটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় তাদের ওপর নীরব চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং কেউ কেউ সরাসরি পদত্যাগের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন।
১১ দলীয় জোট ঘোষণার পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তে প্রথম প্রতিবাদ জানান ছয় নারী নেত্রী। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম পদত্যাগ করেন ডা. তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীন। বাকি চারজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। পরবর্তীকালে এনসিপির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শীর্ষ নেতার কাছে স্মারকলিপি দেন। সেখানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা ও গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ উল্লেখ করে বলা হয়, এ ধরনের দলের সঙ্গে জোট এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দলীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় কমিটির ৪০-এর বেশি সদস্য আসন সমঝোতার জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবু দলীয় প্রধান নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমদের নেতৃত্বে জোট চূড়ান্ত হয়। এর পরই দলটিতে পদত্যাগের হিড়িক পড়ে।
পদত্যাগকারীদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় সদস্য ও ফরিদপুরের সমন্বয়ক সৈয়দা নীলিমা দোলা, রাজশাহী জেলা যুগ্ম সমন্বয়ক শামীমা সুলতানা মায়া এবং উত্তরাঞ্চলীয় সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী। এছাড়া পদত্যাগ না করেও নির্বাচনী কার্যক্রম ও প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ান কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা, মনিরা শারমিন এবং কেন্দ্রীয় নেত্রী মঞ্জিলা ঝুমা।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গত ২৫ ডিসেম্বর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ছয় নারী নেত্রী—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, সামান্তা শারমিন ও নাহিদা সারোয়ার নিভা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে আপত্তি জানান। তারা যুক্তি দেন, আদর্শিক অবস্থানের প্রশ্নে এই জোট দলীয় অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ওই বৈঠকেই কয়েকজন স্পষ্টভাবে বলেন, আনুষ্ঠানিক জোট হলে তারা পদত্যাগের কথা বিবেচনা করবেন। তবে তাদের আপত্তি গুরুত্ব পায়নি।
পরে জোট আনুষ্ঠানিক হয় এবং আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করা হয়। এরপরই তাজনূভা জাবীন ও তাসনিম জারা পদত্যাগ করেন। ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। অনেকেই তার পদত্যাগকে জোটবিরোধিতার ফল হিসেবে দেখলেও তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।
নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত না থাকা এক শীর্ষ নারী নেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জোটের সমালোচনা করায় তাকে সরাসরি পদত্যাগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তার দাবি, তাকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়েছিল—পদত্যাগ করতে হবে অথবা জোট নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
তবে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, দল থেকে কাউকে পদত্যাগের জন্য কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। জোট গঠন ও দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত দল আনুষ্ঠানিকভাবে কারও বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি বলে থাকে যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাহলে সেটি ভুল তথ্য।’ এ ছাড়া যারা নির্বাচন করেননি বা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন, সেটিকে তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
জোট নিয়ে ভিন্নমত পোষণকারীদের বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরা শারমিন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।’ পাশাপাশি দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে আগ্রহীদের জন্য সুযোগ খোলা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘দরজা খোলা আছে, তারা চাইলে আসতে পারে।’
দলের ভেতরে চাপ বা অসন্তোষের বিষয়ে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয় বলেও দাবি করেন এনসিপির এই নেত্রী। তিনি বলেন, ‘এমন কিছু হলে আমি জানতাম।’
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা দলটির সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ও ফরিদপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দা নীলিমা দোলা বলেন, ‘তাকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি।’ এছাড়া পদত্যাগকারীদের ওপর উচ্চপর্যায় থেকে চাপ সৃষ্টির বিষয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো অভিজ্ঞতা নেই বলেও জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় কার্যক্রমে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, তাকে দল ছাড়ার জন্য কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার বিষয়ে নির্লিপ্ততাই দেখা গেছে।’
কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ফারজানা দিনাও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো চাপ অনুভব করেননি। তবে অন্য কারও বিষয়ে মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেও জানান।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে ৩০টি আসনে সমঝোতা করে এনসিপি। দলটি ছয়টি আসনে জয় পায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অন্তত ১২টি আসনে সমঝোতার পরও জোট শরিক জামায়াত, খেলাফত মজলিস, এলডিপি ও এবি পার্টির প্রার্থী এনসিপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
দলের ভেতরে চাপ ছিল কি না—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলছে না। একদিকে নীরব চাপ ও ইঙ্গিতের অভিযোগ, অন্যদিকে শীর্ষ নেতাদের অস্বীকার। ফলে জোট-পরবর্তী এই বিতর্ক এনসিপির ভেতরের মতপার্থক্যকেই সামনে এনে দিয়েছে।