৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থী ভোটকে একত্রিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ইসলামপন্থী দলের এক সভায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের আলোচনা সামনে আসে। পরে নানা ঘটনা এবং গুজবের পরে এই উদ্যোগে জামায়াতে ইসলামীও যুক্ত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত জোটটি টেকেনি।
আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের জেরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ওই উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ায়। একই সময়ে শেষ মুহূর্তে জোটে যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ফলে ইসলামপন্থী ভোটকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার যে পরিকল্পনা ছিল, তা সম্পুর্ণভাবে বাস্তবে রূপ না পেয়ে আংশিক রুপ পায়। গঠিত হয় জামায়াতের নেতৃত্বে ১০ দলীয় জোট, যাকে এনসিপি বলছে নির্বাচনী সমঝোতা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিভক্তির প্রভাব ভোটের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে ২৫৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রায় ২০ লাখের বেশি ভোট পেলেও তারা মাত্র একটি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে এনসিপি মাত্র ৩২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি ভোট পেয়ে ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ মোট ভোটে ২ লাখের মতো ব্যবধান থাকলেও আসনের হিসাবে এনসিপি এগিয়ে গেছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ভোট পেয়েছে এবং দুটি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া খেলাফতভিত্তিক আরেকটি দল ২০টির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার ভোট পেয়ে একটি আসনে জয়লাভ করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দুটি আসনের ফল স্থগিত থাকলেও দলটি ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মোট ২১১টি আসনে জয় পেয়েছে। বিএনপি পেয়েছে তিন কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৫৪ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৪৯.৯৭ শতাংশ।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ২২৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে দুই কোটি ৩৮ লাখ ২৫ হাজার ২৫৯ ভোট পেয়েছে, যা মোট ভোটের প্রায় ৩১.৭ শতাংশ। এই ভোটে তারা ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সারাদেশে ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৪৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ ভোট পেয়েছেন, যা মোট ভোটের প্রায় ৫.৭৯ শতাংশ। এদের মধ্যে সাতজন প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এনসিপি ৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ২২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৯৫ ভোট পেয়েছে, যা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৩.৫ শতাংশ। এই ভোটে দলটি ছয়টি আসনে জয় পেয়েছে। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রায় ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৪০ ভোট পেয়েও একটি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে।
নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সংখ্যার দিক থেকেও বৈচিত্র্য ছিল। ৩০ বা তার বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে এমন দল রয়েছে ১২টি। ২০ থেকে ২৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আটটি দল। ১০ থেকে ১৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে ১১টি দল। আর ১০টির কম আসনে প্রার্থী দিয়েছে ১৯টি দল। এর মধ্যে কয়েকটি দল মাত্র এক থেকে তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
একটি আসনে প্রার্থী দেওয়া দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- গণতন্ত্রের পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ সাম্য অধিকার পার্টি এবং বাংলাদেশ ন্যাপ। দুটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামিক ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। আর তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী পার্টি ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।
অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ৯৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার ভোট পেয়ে একটি আসনে জয়লাভ করেছে। গণসংহতি আন্দোলন ১৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় এক লাখ ৪ হাজার ৮১২ ভোট পেয়ে একটি আসনে জয় পেয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এক লাখ পাঁচ হাজার ৭৮৯ ভোট পেয়ে একটি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়েও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) কোনো আসনে জয় পায়নি। দলটি মোট দুই লাখ ১০ হাজার ৫৬২ ভোট পেয়েছে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছোট দলগুলোর মধ্যে কয়েকটির ভোটের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি পেয়েছে মাত্র ১৬৯ ভোট। গণতন্ত্রের পার্টি পেয়েছে ১৫১ ভোট। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি পেয়েছে ৫৭৯ ভোট, গণফ্রন্ট পেয়েছে ৭৫৩ ভোট এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একটি অংশ পেয়েছে ৭৭২ ভোট। অর্থাৎ সারাদেশে পাঁচটি দল রয়েছে যারা এক হাজারের কম ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দল মাত্র একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।