জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে বাধ্যবাধকতামূলক আইন হিসেবে নয়, বরং সমঝোতার ভিত্তিতে করা একটি কমিটমেন্টের আইন হিসেবে দেখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, এই আদেশকে ‘হার্ড এন্ড ফার্স্ট’ বা কঠোর বাধ্যবাধকতামূলক আইন হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে একটি সমঝোতার জায়গা থেকে করা প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টায় এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে অনলাইনে অনুষ্ঠিত প্রবাসীদের প্রতিবাদ সভায় তিনি এ কথা বলেন। জুলাই সনদ ও গণভোটে জনরায় বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের টালবাহানার প্রতিবাদে এই সভার আয়োজন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সভায় বক্তব্য রাখেন এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে পবিত্র ওয়াদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই পবিত্র ওয়াদাকে আইনের ভাষায় বিবৃত করা হয়েছে, কিন্তু এর বিপরীতে কোনো শাস্তির বিধান রাখা হয়নি।
সংস্কার বাস্তবায়ন বিষয়ক এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি আরও বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ক্ষেত্রে প্রবাসী ভোটারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, তার নির্বাচনী আসনের অনেক স্থানীয় কেন্দ্রে তিনি পরাজিত হলেও পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এমনকি ১১ দলীয় জোটের যেসব প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, তাদের অনেকেই প্রবাসী ভোটের কারণে বিজয়ী হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি ঐকমত্য কমিশনে সনদের প্রতিটি পয়েন্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছে। তার মতে, এই খুঁটিয়ে দেখার পেছনে তাদের অসততা ছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বিশ্লেষণ করে তিনি আরও বলেন, আদেশে সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন না করলে কোনো শাস্তিমূলক বিধান রাখা হয়নি। ফলে সরকার সেই আদেশ মানছে না।
আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে এমন একটি বিধান থাকা প্রয়োজন ছিল, যেখানে বলা থাকবে—কোনো সংসদ সদস্য একসঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল বলে গণ্য হবে।
সভায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ থেকেই এসেছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি নতুন বাংলাদেশে যাব। যারা শহীদ হয়েছেন ও আহত হয়েছেন, তারা আমাদের সামনে সেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরেছেন।”
জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নে বিলম্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার আন্দোলনকারীদের রাজপথে নামাতে ও ক্লান্ত করতে চাইছে। তিনি বলেন, “তারা আমাদের রাজপথে নামাতে চান, টায়ার্ড করতে চান, হসপিটালে পাঠাতে চান। কিন্তু আমরা তাদের এই ফাঁদে পা দেব না।”
প্রবাসীদের আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন, বাংলাদেশের রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, ‘এই সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যেখানেই যাবেন, সেখানে আপনারা তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন।’
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে জনগণের মোহভঙ্গ হতে তিন বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু বিএনপির বিষয়ে শহীদ পরিবার, আহত জুলাইযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ হতে এক মাসও লাগেনি। তার ভাষ্য, ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
সারোয়ার তুষার বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে বিএনপিকেও এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে যা যা করণীয়, এনসিপি সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ফাহিম মাশরুর বিএনপি সরকারের সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী কোনো শক্তির প্রভাব থাকতে পারে।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন- এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক সাইফ ইবনে সারোয়ার, সদস্য সচিব নাজমূল বাশার, এনসিপি ফ্রান্স শাখার আহ্বায়ক ইফতেশাম চৌধুরী, আমেরিকা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব আজওয়াদ হায়দার, মিডিয়া ও ব্র্যান্ডিং লিড উল্লাস জায়েদ এবং জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কমিটির সদস্য ওমর ঢালী।