বিটিএল গ্রুপের মির্জা বাশার ‘মহাপ্রতারক’
তিনি যা দেখেন, তা-ই গ্রাস করেন। তার ফাঁদে একবার পা দিলে কোটি টাকার সম্পত্তি কিংবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পুঁজি—সবকিছু হাওয়া হয়ে যায় মুহূর্তেই। তিনি আর কেউ নন, বহুল আলোচিত বিটিএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মির্জা আবুল বাশার।
কোরবানির ঈদের আগে দিন-রাত এক করে বড় করা খামারিদের গরু কিনে ‘ফাঁকা বাউন্স চেক’ দিয়ে প্রতারণার অভিযোগের কালি এখনো শুকায়নি। তার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এসেছে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ও কম্পিউটার জালিয়াতির দীর্ঘ তালিকা। শুধু রাজধানীর গুলশান ও বনানী থানাতেই এই মির্জা বাশারের বিরুদ্ধে রয়েছে এক ডজনেরও বেশি মামলা! বেশ কয়েকবার জেল খাটলেও জামিনে বের হয়ে এসে আবারও একই কায়দায় মেতে ওঠেন নতুন কোনো জালিয়াতিতে। এখনো বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট রয়েছে।
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, মির্জা বাশারের প্রতারণার নেটওয়ার্ক কোনো একটি সুনির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ যুবকদের কাছ থেকে লিখিত চুক্তিতে মাসিক ভাড়ায় প্রাইভেটকার নিয়ে মাসের পর মাস ভাড়া দেন না, উল্টো গাড়ি চাইলে রংপুর বা কুয়াকাটার ভুয়া লোকেশন দিয়ে গাড়ি একবারে উধাও করে দেন। অন্যদিকে, ব্যবসায়িক কাজের কথা বলে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম্পিউটার ও আইটি সামগ্রী কিনে তার টাকাও হজম করে ফেলার সুনির্দিষ্ট নজির রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমনকি গুলশানের একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগে গণপিটুনি ও মারধরের শিকার হয়েছেন এই কথিত সিইও।
কার শক্তিতে বছরের পর বছর এই ওপেন সিক্রেট জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছেন মির্জা আবুল বাশার? জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে নিজের প্রতারণার ব্যবসাকে আরও শক্ত করেছিলেন বাশার।
এমনকি ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও তিনি বহাল তবিয়তেই অপরাধের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন। ভুক্তভোগীদের গুরুতর অভিযোগ—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখেন বাশার। আর এই কারণেই সাইফুল ইসলামের মতো সাধারণ ভুক্তভোগীরা যখনই থানা বা ডিবিতে অভিযোগ করতে যান, মুহূর্তের মধ্যে সেই তথ্য বাশারের কাছে পৌঁছে যায়!
মির্জা বাশারের এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে কেউ যদি টু শব্দ করে কিংবা নিজের পাওনা টাকা বা সম্পত্তি ফেরত চায়, তবেই নেমে আসে নারকীয় নির্যাতন। অভিযোগকারী এবং তার পরিবারকে দিন-রাত মোবাইলে হুমকি দেওয়া এই চক্রের নিয়মিত কাজ।
শুধু তা-ই নয়, মির্জা বাশারের রয়েছে একটি বিশাল বেতনভুক্ত ‘সাইবার বাহিনী’। কোনো ভুক্তভোগী আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলে বা সামাজিক মাধ্যমে মুখ খুললে, এই সাইবার বাহিনী দিয়ে উল্টো ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানারকম কুৎসিত ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকভাবে হেনস্তা ও ব্ল্যাকমেইল করা হয়। বাশারের এই ত্রিমুখী আক্রমণের কারণে অনেক ভুক্তভোগীই এখন মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মির্জা বাশার একজন ভয়ংকর প্রতারক, তাকে প্রতারণা মামলায় বেশ কয়েকবার আটক করা হয়েছে, এরপর সে জামিনে বের হয়ে এসে আবারও একই কাজ করে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যবসায়িক খাতের পাশাপাশি মির্জা বাশারের ব্যক্তিগত জীবনও যেন এক নিখুঁত জালিয়াতির চিত্রনাট্য। এ পর্যন্ত তিনি তিনটি বিয়ে করেছেন, যার প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে প্রতারণার আশ্রয়। প্রথম স্ত্রীকে ঘরে রেখেই সম্পূর্ণ তথ্য গোপন করে নিজেকে ‘অবিবাহিত’ দাবি করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন মির্জা বাশার। পরবর্তী সময়ে বাশারের আগের সংসারের কথা জানাজানি হলে এবং প্রতারণা ফাঁস হয়ে গেলে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে যায়। কিন্তু এই স্বভাবজাত প্রতারকের জাল এখানেই থামেনি। এরপর তিনি নিজের কর্পোরেট ও চটকদার আভিজাত্যের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেন ঢাকার চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা ববিকে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—সিনেমার পর্দায় খলনায়কদের দমন করা চিত্রনায়িকা ববিও কি শেষ পর্যন্ত এই বাস্তব জীবনের মহাপ্রতারকের শিকার হলেন?
একটি বাউন্স হওয়া চেক, ডজনখানেক মামলা, দফায় দফায় জেল খাটা, অবৈধ প্রভাব আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এ নিয়েই টিকে আছে বিটিএল গ্রুপের মির্জা আবুল বাশারের সাম্রাজ্য। আইনের ফাঁকফোকর গলে এবং টাকার জোরে আর কতদিন সাধারণ মানুষের বুকচাপড়ানো কান্না নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন এই মহাপ্রতারক?
ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি—উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তের মাধ্যমে এই সংঘবদ্ধ চক্র ও সাইবার মাফিয়া বাহিনীকে দমন করা হোক।