ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক ও পক্ষপাতমূলক উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন এনসিপি ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মনিরা শারমিন। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর দেওয়া তার লিখিত আবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে, যা তিনি নিজেই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন।
লিখিত আবেদনে মনিরা শারমিন দাবি করেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও)-এর অনুচ্ছেদ ১২(১)(এফ) অনুযায়ী তার মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসর নেওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। তবে একই বা অনুরূপ আইনি অবস্থানে থাকা ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে ইসির নিরপেক্ষতা, সমতা ও আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন মনিরা শারমিন।
এ ছাড়া আবেদনে তিনি চারজন প্রার্থীর বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেন। যেমন মাধবী মারমার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন, তিনি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী এটি একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সদস্যরা জনসেবক হিসেবে গণ্য। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তিনি এখনো পদত্যাগ করেননি। সে ক্ষেত্রে আরপিওর অনুচ্ছেদ ১২(১)(সি) ও ১২(১)(এফ) অনুযায়ী অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে আন্না মিনজের বিষয়ে আবেদনে বলা হয়, তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস পদে কর্মরত ছিলেন বা আছেন বলে প্রকাশ্য তথ্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী হওয়ায় আরপিওর এর অনুচ্ছেদ ১২(১)(আই) অনুযায়ী তার ক্ষেত্রেও তিন বছরের শর্ত প্রযোজ্য হওয়া উচিত ছিল।
সেই সঙ্গে জেবা আমিন খানের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি দ্বৈত নাগরিক (বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য) হিসেবে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন এবং গত ২১ এপ্রিল যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন। তবে নাগরিকত্ব ত্যাগ কার্যকর হওয়ার আগে তার যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই ছাড়া মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলে তা আইনগত প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সবার শেষে ফাহমিদা হকের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের পরিচালক ছিলেন এবং ১৯ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন বলে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী হলে তার ক্ষেত্রেও আরপিওর এর অনুচ্ছেদ ১২(১)(আই) প্রযোজ্য হতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মনিরা শারমিন অভিযোগ করেন, তার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হলেও অনুরূপ পরিস্থিতিতে অন্যান্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানো হয়েছে, যা সংবিধানের সমতার নীতি ও অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মানদণ্ডের পরিপন্থী। এ প্রেক্ষাপটে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানান। যার মধ্যে রয়েছে—উল্লিখিত প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত, তার নিজের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন, সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গ সংগঠন জাতীয় নারীশক্তির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মনিরা শারমিন আবেদনের শেষে আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশন ন্যায়, সমতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
অন্যদিকে মনিরা শারমিন তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে খোদ নির্বাচন কমিশনের বৈষম্যমূলক, পক্ষপাতমূলক ও আইনবহির্ভূত আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম। এই প্রতিবাদ আরও বড় পরিসরে হওয়া উচিত ছিল। কেন হলো না তার উত্তর আমার জানা নাই।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের চারজন প্রার্থীর মধ্যে একজন দ্বৈত নাগরিক, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের। বাকি দুজন আন্তর্জাতিক সংস্থায় নির্বাহী প্রধান ছিলেন, আরেকজন বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য, যা একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদ, যা সরাসরি আইন বহির্ভূত। এই চারজন নির্বাচনের অযোগ্য হলেও তারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বলে কেউ টু শব্দটি করল না। হায় সেলুকাস!’