বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে ফিফাকে নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর এক মার্কিন ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে সমালোচনা, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কিছু ম্যাচে রেফারিং ও সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ, সব মিলিয়ে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, এসব বিতর্ক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে ফিফার দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সামনে এনে তারা বলছেন, মানবাধিকার প্রশ্নে সংস্থাটির ভূমিকা বহু আগ থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে পুরোনো অভিযোগ
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) বহুবার দাবি জানিয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে ক্লাব পরিচালনার কারণে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (আইএফএ) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হোক। কিন্তু ফিফা সেই দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের হত্যা, আহত হওয়া কিংবা গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোতেও ফিফার নীরবতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ফিলিস্তিন নারী দলের খেলোয়াড় র্যান্ড হালাওয়ানি ও নাতালি আবু দায়েহর মুক্তির দাবিতেও সংস্থাটি প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে স্টেডিয়াম ধ্বংস এবং দলগুলোর চলাচলে বাধা নিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সমালোচকদের দাবি, আইএফএ শুধু বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য (অ্যাপারথেইড) ও দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক করতেই ভূমিকা রাখেনি, বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারদের প্রশংসাও করেছে।
আইনি অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) একাধিক রায় এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা এখনও বলে আসছে, ফিলিস্তিনের অভিযোগগুলো ‘আন্তর্জাতিক জনআইনের অধীনে অত্যন্ত জটিল বিষয়’ এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সমালোচকদের মতে, এই অবস্থান কার্যত ইসরায়েলের ব্যাখ্যাকেই সমর্থন করে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
তাদের অভিযোগ, পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম ও কৃষির মতো ফুটবলকেও ইসরায়েল দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং ফিফা সে ক্ষেত্রে কার্যকর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ইনফান্তিনোকে ঘিরেও অভিযোগ
সমালোচকদের মতে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সময়েই এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগও জানিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নেননি এবং এ বিষয়ে পাঠানো অসংখ্য প্রতিবেদন ও চিঠি উপেক্ষা করেছেন।
এ ছাড়া ইসরায়েলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার প্রচেষ্টায়ও ফিফা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত মাসে অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায়ের একটি টুর্নামেন্টে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’। এমনকি কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে পিএফএর সভাপতিকে তার ইসরায়েলি সমকক্ষের সঙ্গে করমর্দন করতে চাপ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
সমালোচকদের ভাষ্য, ফিফা এখন আর পুরোপুরি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে কাজ করছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব সংস্থাটির কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই অভিযোগের পক্ষে তারা কয়েকটি উদাহরণও তুলে ধরেছেন। ২০১৮ সালে ইনফান্তিনো ওয়াশিংটনে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি ডানপন্থী ইসরায়েলি পত্রিকা জেরুজালেম পোস্ট-এর এক সম্মেলনে অংশ নেন, যা জেরুজালেমের মামিল্লাহ মুসলিম কবরস্থানের জায়গায় নির্মিত একটি স্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। সমালোচকদের দাবি, এই সংগঠনের লক্ষ্য জাতিসংঘকে ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক আইনি উদ্যোগকে দুর্বল করা। সেই অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ফুটবলের মাধ্যমে পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি 'কৌশলগত অংশীদারত্ব'-এর ঘোষণাও দেন।
বিশ্বকাপ বিতর্কে নতুন মাত্রা
বিশ্বকাপ আয়োজন ঘিরে চলমান বিতর্কগুলোকেও অনেকেই এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে ফিফা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুটবলকে রাজনীতিমুক্ত রাখার দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্র আয়োজক দেশ হিসেবে খেলোয়াড়, রেফারি ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার পর ইনফান্তিনো জনসাধারণকে ‘শান্ত থাকুন, আরাম করুন’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সমালোচকদের মতে, এমন ঘটনাগুলো ফিফার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে লেখকের মতে, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিলিস্তিনি ফুটবল থেমে থাকবে না। ১৯০৪ সালে জেরুজালেমের সেন্ট জর্জ স্কুল দলের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ফুটবল আজও ফিলিস্তিনিদের পরিচয় ও সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দখলদারিত্ব, গণহত্যা কিংবা বিতর্ক; সবকিছুর মধ্যেও সেই লড়াই চলবে।
সূত্র - আল জাজিরা