সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সিসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়ার জন্য কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স না পৌঁছানোয় খালেদা জিয়ার লন্ডন যাওয়া পিছিয়ে যাচ্ছে বলে বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে দেওয়া এক পোস্টে জানানো হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্ধৃতি দিয়ে এতে জানানো হয়, ‘কারিগরি ত্রুটি’র কারণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এটি আজ (শনিবার) পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা যদি যাত্রার জন্য উপযুক্ত থাকে এবং মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ ৭ ডিসেম্বর (রোববার) তিনি লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার দুপুরে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছিলেন, শুক্রবার মধ্যরাত বা ভোরের দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হবে।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে চিকিৎসকসহ মোট ১৮ জন সফরসঙ্গী হিসেবে লন্ডনে যাবেন। তারা হলেন- খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, ছোট ছেলে কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, ডা. ফখরুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, ডা. শাহাবুদ্দীন তালুকদার, ডা. নুরুদ্দীন আহমদ, ডা. রিচার্ড বিলি, ডা. জিয়াউল হক, ডা. জাফর ইকবাল, ডা. মোহাম্মদ আল মামুন। আরও থাকবেন হাসান শাহরিয়ার ইকবাল, সৈয়দ শামীন মাহফুজ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সহকারী মো. আব্দুল হাই মল্লিক, সহকারী ব্যক্তিগত সচিব মো. মাসুদার রহমান, গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম ও গৃহকর্মী রুপা শিকদার।
পরে এদিন রাতে বিএনপির প্রেস উইং জানায়, কাতারের আমিরের যে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার কথা রয়েছে সেটিতে কারিগরি সমস্যার কারণে এই যাত্রা দেরি হবে।
এদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ও খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমান শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সকাল ১১টার দিকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। তিনি খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিতে এসেছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এদিকে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঢাকার বসুন্ধরায় এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার সকাল থেকে হাসপাতালের বাইরে বিজিবি ও পুলিশ এবং হাসপাতালের ভেতরে এসএসএফ সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। তবে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার খবর পেয়ে সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মী ছাড়াও উৎসুক জনতার ভিড় ছিল হাসপাতালের সামনে।
শারীরিক জটিলতা নিয়ে গত ২৩ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে পরে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে ‘সংকটাপন্ন’ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার খবর আসে গণমাধ্যমে।
তারপর থেকে বিভিন্ন সময় তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে বলেই জানিয়েছে দলটির মুখপাত্র।
এসময় তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় এলেও সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে তিনি জানান, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
এরই মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার আলোচনা এসেছে বার বার। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ ছাড়া এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
সবশেষ বৃহস্পতিবার তাকে চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই সঙ্গে খালেদা জিয়াকে নিয়ে যেতে তার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমান বাংলাদেশে আসছেন বলেও জানা যায়।
৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া বহু বছর ধরেই লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।
ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে সিসিইউতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো।
এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত, তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দুর্নীতির আরেকটি মামলাতেও তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় উঠেন।
২০২৪ সালে আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাকে সব দণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান।
পরে ফিরে আসার পরেও ঢাকায় আরও কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে বেগম জিয়াকে।
সবশেষ ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর তিনি আরও অসুস্থ হয়ে যান ও তার শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়ে ওঠে বলে জানা যায়। এ অবস্থায় গত ২৩ নভেম্বর তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় যে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
সূত্র: বাসস