ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা কাগজে-কলমে চূড়ান্ত হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সেই ঐক্যের প্রতিফলন নেই। জোট-ঘোষিত সমঝোতা অনুযায়ী জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ৩০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও শেষমুহূর্তে অন্তত ৬৪টি আসনে জোট শরিকদের প্রতীকে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জামায়াত জোটের এই জটিলতা নিয়ে নানা জল্পনা এখন পাখা মেলছে।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২০ জানুয়ারি। সেই তারিখ পার হলেও বহু আসনে প্রার্থীরা সরে দাঁড়াননি। ফলে চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ২২৪টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৩টি, এনসিপি ৩০টি, খেলাফত মজলিস ২০টি, এলডিপি ১২টি, খেলাফত আন্দোলন ৮টি, এবি পার্টি ৩টি, নেজামে ইসলাম ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুটি করে এবং জাগপা একটি আসনে প্রার্থী রেখেছে।
জোট সূত্র জানায়, সমঝোতা অনুযায়ী এনসিপির ২৯টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করার এবং একটি আসন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে উন্মুক্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অন্তত ১২টি আসনে এনসিপির প্রার্থীদের বিপরীতে জামায়াত, খেলাফত মজলিস, এলডিপি এবং এবি পার্টির প্রার্থী রয়ে গেছেন।
তৃণমূলে চিত্র আরও জটিল। রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন নির্বাচন করলেও একই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী রয়েছেন। শরীয়তপুর-১ আসনে দলটির মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদের বিপরীতে এনসিপির প্রার্থী রয়েছেন। নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার তুষারের বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী মাঠে আছেন। একই পরিস্থিতি রাজশাহী-১, ময়মনসিংহ-৫, ঢাকা-১৪, লক্ষ্মীপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনেও।
তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বলছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে মোট ২৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের মনোনয়নের মাধ্যমে এই তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক। শরীয়তপুর-১ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদকে। ফরিদপুর-২ আসনে মাওলানা আব্দুল আলী এবং ফরিদপুর-৩ আসনে মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে মুফতি সাদ্দাম নূর, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে অ্যাডভোকেট শফিউর পাশা চৌধুরী এবং ফেনী-২ আসনে মাওলানা হারুনুর রশিদ ভূইয়া প্রার্থী হয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-১ আসনে মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ হাদী এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে মুফতি নূর হুসাইন নূরানীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
মাদারীপুর-২ আসনে মাওলানা আব্দুস সুবহান, গাজীপুর-৩ আসনে মাওলানা এহসানুল হক এবং নরসিংদী-৩ আসনে মাওলানা রাকিবুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গোপালগঞ্জ-২ আসনে মুফতি সোহাইব ইব্রাহিম এবং ময়মনসিংহ-২ আসনে মুফতি আব্দুল ওয়াহাব প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
মেহেরপুর-১ আসনে গোলাম রব্বানী, চট্টগ্রাম-৫ আসনে মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে মুফতি আমজাদ হুসাইন আলবাছী প্রার্থী হয়েছেন। নরসিংদী-৫ আসনে মাওলানা তাজুল ইসলাম এবং সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে মাওলানা আব্দুর রউফ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাঙামাটি-১ আসনে মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক, ময়মনসিংহ-১ আসনে মাওলানা তাজুল ইসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মাওলানা শাহজাহান বিল্লা প্রার্থী হয়েছেন। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মাওলানা আব্দুল আজিজ মনি এবং মাদারীপুর-১ আসনে মাওলানা সাদ্দাম উদ্দিন জাহাঙ্গীরনগরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল-১ আসনে মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরী, সিলেট-৩ আসনে মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু এবং মৌলভীবাজার-৪ আসনে মাওলানা নূরে আলম হাসিমী প্রার্থী হয়েছেন। ফরিদপুর-৪ আসনে মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে খন্দকার আনোয়ারকে প্রার্থী করেছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক হাসান জুনাইদ বলেন, ‘আমাদের জোটের এমন একাধিক আসনে দুই দলের প্রার্থী আছে, যেমন ফরিদপুর-৪ আসনে আমাদের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী উভয়ই আছে। আবার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আমাদের প্রার্থীও নির্বাচন করছেন, এনসিপির প্রার্থীও নির্বাচন করছে। মৌলভীবাজারের একটি আসন উন্মুক্ত করা হয়েছে সেখানে এনসিপি ও আমাদের প্রার্থী নির্বাচন করছে।’
জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে এক আসনে একাধিক প্রার্থী কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জুনাইদ বলেন, ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোটে শেষ পর্যন্ত না থাকায় এমনটা হয়েছে।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তাদের জন্য যেসব আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল পরে সেগুলোর বেশিরভাগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সেসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’
১১ দলীয় জোট মনোনীত ঢাকা বিভাগের একটি জেলার আসনের এক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমার (শাপলা কলি) সঙ্গে সবার কাজ করার কথা। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় নেতাকর্মীদের ধরে রেখেছেন। এখনো আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়া হয়নি। মাঠে গুঞ্জন আছে—প্রার্থী প্রকাশ্যে না নামলেও গোপনে প্রতীকটির পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সার্বিক পরিবেশ থমথমে। বিএনপি ভোটকেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা করছে বলেও শোনা যাচ্ছে। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে দখল প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
নরসিংদী-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার তুষার বুধবার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘এক দল লোক জামায়াতে ইসলামীর নাম ব্যবহার করে নরসিংদী-২ আসনে জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আজ তারা মিছিলও করেছেন।’ তিনি আরও লেখেন, ‘জামায়াতের দায়িত্বশীলরা এসব বিষয়ে অবগত নন। অথচ এ ধরনের গোপন মিছিল ও প্রচারণা থেমে যাচ্ছে না। এটা সত্যিই অদ্ভুত পরিস্থিতি।’
তিনি আরও জানান, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) জামায়াতে ইসলামীর সম্মানীত আমির আমাকে নরসিংদী-২ আসনের জোট প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এবং আমার হাতে শাপলা কলি প্রতীক তুলে দিয়েছেন। এর আগে দলের পক্ষ থেকে সম্মানীত সেক্রেটারি জেনারেল জনাব গোলাম পরওয়ার ইসিতে চিঠি দিয়েছিলেন যাতে ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা না থাকে।’
আরও লেখেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সংগঠন কেন্দ্রের নির্দেশনা মোতাবেক জোটের পক্ষে থাকবে।’
উল্লেখ্য, ১১ দলীয় জোটের সমঝোতা অনুযায়ী এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষারকে নরসিংদী-২ আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বাকি ১০ দলের পক্ষ থেকে।
তবে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নরসিংদী-২ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী সারোয়ার তুষারের আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা শাখার সেক্রেটারি আমজাদ হোসাইন।
তবে আমজাদ হোসাইনকে মনোনয়ন না দিয়ে এনসিপির তুষারকে প্রার্থী করার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াত প্রার্থী আমজাদ হোসাইন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। তবে একই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ফারুক ভূঁইয়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
জোট সূত্র জানায়, দীর্ঘ আলোচনার পর ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৩টি আসনে সমঝোতা হলেও বাকি আসনগুলোতে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তবে যেসব আসনে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলোতেও জোট শরিক জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন বলে জানা যায়।
গত ১৫ জানুয়ারি সমঝোতার মাধ্যমে ঘোষিত আসনগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ১৭৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক হিসেবে এনসিপি পেয়েছে ৩০টি আসন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি সাতটি, এবি পার্টি তিনটি এবং নেজামে ইসলাম ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুটি করে আসন পেয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার না হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী কৌশল ও কার্যকর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে গত ২৩ জানুয়ারি এই জোটের সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনকে দেওয়া চিঠিতে বলেছে, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমরা নরসিংদী-২ আসনে মো. আমজাদ হোসাইনকে ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে মো. আবু নাসেরকে মনোনয়ন দিয়েছিলাম।
কিন্তু ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে নরসিংদী-২ আসনটি এনসিপি মনোনীত সারোয়ার তুষারকে এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনটি এনসিপি মনোনীত প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফকে ছেড়ে দিয়েছি। আসন দুটিতে জামায়াত মনোনীত দুই প্রার্থী যথাসময়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি। তাই ওই দুটি আসনের ব্যালট পেপারে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখার জন্য অনুরোধ করছি।’
আবার ২৪ জানুয়ারি সিইসিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে জামায়াত বলেছে, ‘ভোলা-২ আসনে মোহাম্মদ ফজলুল করিম, নরসিংদী-৩ আসনে মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, সুনামগঞ্জ-১ আসনে তোফায়েল আহমদ ও চট্টগ্রাম-১২ আসনে মোহাম্মদ ফরিদুল আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।’
জামায়াত ওই চিঠিতে বলে, ‘কিন্তু ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে ভোলা-২ আসনটি এলডিপি মনোনীত প্রার্থী মোকফার উদ্দিন চৌধুরী, নরসিংদী-৩ আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত মো. শাহজাহান, সুনামগঞ্জ-১ আসনটি নেজামে ইসলাম পার্টি মনোনীত মাওলানা মোজাম্মেল হক তালুকদার এবং চট্টগ্রাম-১২ আসনটি এলডিপি মনোনীত এম ইয়াকুব আলীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী যথাসময়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি। এই পাঁচ আসনের ব্যালট পেপারে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখার জন্য অনুরোধ করছি।’
শরিক জোটের প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করা প্রসঙ্গে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের জোটের প্রায় ৫ শতাংশ আসনে জোট মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে জোটের আরেক দলে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুই প্রার্থী বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করতে পারেননি, তবে তারা মাঠে একসঙ্গে কাজ করছে। গত এক থেকে দেড় বছর ধরে যারা কাজ করে আসছেন, তাদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে উইথড্রয়ালের সময় মান-অভিমান দেখা গেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে আমরা যতগুলো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলো সমাধান করেছি। আমাদের শরিক দলের প্রার্থীও আমাদের প্রার্থীর সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ করছেন। কিছু আসন আমরা স্বতঃসিদ্ধভাবে উন্মুক্ত রেখেছি এবং যেখানে এখনো সমন্বয় প্রয়োজন, সেখানে আমরা কাজ করছি। সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের জোটের কার্যক্রম এখনো চলমান।’
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে বৃহস্পতিবার দুপুরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি। পাশাপাশি দলটির নির্বাচনী প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকেও বুধবার রাতে একাধিকবার ফোন করা হয়, তবে তিনিও সাড়া দেননি।
এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো প্রার্থী মাঠে থাকলে তা জোটের রাজনীতিতে গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে আগে থেকেই নির্দিষ্ট দলের প্রার্থী ছিল এবং তারা এখনো প্রার্থী প্রত্যাহার করেনি, সেগুলো বড় রাজনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে এই প্রবণতা জামায়াতে ইসলামীতে তেমন দেখা না গেলেও এবার কিছু কিছু এলাকায় সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দলের সামনে কার্যত দুটি পথ খোলা আছে—হয় দলের সিদ্ধান্ত অমান্যকারী প্রার্থীদের দ্রুত বহিষ্কার করতে হবে, নতুবা জোটের সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে কার্যকর করতে হবে। বহিষ্কার ছাড়া এই মুহূর্তে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই। কারণ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া মানে সরাসরি জোটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা।’
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ আরও বলেন, ‘এবারের জোটের রাজনীতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল। দীর্ঘদিন পর নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক বাস্তবতাও অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। অতীতেও, এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত দলগুলো বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মেনে নিতে হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি একেবারেই শেষ মুহূর্তের সংকট, যেখানে বিষয়গুলো দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতির পেছনে আরেকটি কারণ হতে পারে উচ্চকক্ষের নির্বাচন ব্যবস্থা। উচ্চকক্ষে দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব পাবে। ফলে কোনো দল যদি মোট ভোটের এক শতাংশ বা দেড় শতাংশও পায়, তাহলে তারা উচ্চকক্ষে এক বা দুটি আসন পেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলোর মোট ভোট সাধারণত এক থেকে দেড় শতাংশের বেশি নয়, কিন্তু এই ব্যবস্থায় তারাও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেতে পারে। এ কারণেই এবার অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।’