ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে ১৯৪১ সালের সেই দিনটি ছিল একেবারেই আলাদা। চারদিকে বাজছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, ঠিক সেই সময়ে সৌদি আরবের মক্কায় শুরু হয় এক প্রলয়ংকরী বৃষ্টি। বিরামহীন সেই বর্ষণে মরুভূমির শহর মক্কা প্লাবিত হয়ে যায় ও বন্যার পানি ঢুকে পড়ে পবিত্র মসজিদুল হারাম চত্বরে।
কাবার দেওয়াল ছুঁয়ে পানির উচ্চতা তখন প্রায় ৫ থেকে ৬ ফুট। সাধারণ মানুষের জন্য তখন স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করা ছিল অসম্ভব। ঠিক সেই চরম প্রতিকূলতার মাঝে এক কিশোরকে দেখা গিয়েছিল পানির স্রোত ডিঙিয়ে সাঁতার কেটে কাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে। সেই কিশোরটিই ছিলেন বাহরাইনের নাগরিক শেখ আলি আল-আওয়াদি।
সে সময় শেখ আলি আল-আওয়াদির বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। তিনি মক্কার একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করতেন। বন্যার পানি যখন মসজিদুল হারামের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন তিনি ও তার ভাই এবং বন্ধুদের নিয়ে কৌতুহলবশত সেখানে যান। চারদিকে যখন থৈ থৈ পানি, তখন কিশোর আলির মনে এক তীব্র ইচ্ছা জাগে, এই অবস্থাতেই তিনি তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন।
যে ইবাদত সাধারণত হেঁটে সম্পন্ন করা হয়, আওয়াদি তা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন সাঁতার কেটে। তার এই সাহসী ও অনন্য ইবাদতের দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করা হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত। ছবিতে তাকে ঘাড় পর্যন্ত পানির নিচ থেকে কাবার দেয়ালের কোল ঘেঁষে সাঁতার কাটতে দেখা যায়।
২০১৫ সালে ৮৬ বছর বয়সে শেখ আলি আল-আওয়াদি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি সেদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘আমি যখন সাঁতার কাটছিলাম, তখন পুলিশ আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল যে আমি হয়তো ডুবে যাব কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু আল্লাহর ঘরে ইবাদতের সেই তৃপ্তি আমাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।’
ইতিহাসের পাতায় আলি আওয়াদি এখন ‘সেই ব্যক্তি’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন, যিনি আধুনিক যুগে বন্যার পানির ভেতর সাঁতার কেটে তাওয়াফ করার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তার সেই ছবি আজ কেবল একটি আলোকচিত্র নয়, বরং প্রতিকূলতার মাঝেও অটুট ঈমানি শক্তির এক জীবন্ত নিদর্শন।