বিশ্লেষণ
শেষ হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসানের মাধ্যমে শুরু হলো হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির শাসনামল। নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই ছিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যার অন্যতম কারণ ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার মতো প্রতিশ্রুতি। ফলে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটির ভোটের ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায়।
এবারের নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৩৪ শতাংশ বা প্রায় ৩১ লাখ ১০ হাজার ভোটার মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ, সেই হিসেবে বাদ পড়া ভোটারের তালিকায় মুসলমান ভোটারের সংখ্যা রাজ্যটিতে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে অনেকটাই বেশি। এর মধ্যে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ১০টি জেলায় সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে যা প্রায় ৫৭ শতাংশ। এই জেলাগুলোর মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের ৭০ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। তৃণমূল কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলগুলো বলছে, এই তালিকায় বিজেপিকে সুবিধা দিতে মুসলিম সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
যদিও তালিকায় বাদ পড়া অধিকাংশ ভোটারই মৃত, স্থানান্তরিত বা ভুয়া ভোটার বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে বাদ পড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ২৭ লাখ মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই বাদ পড়েছে, যাদের ভাগ্য নির্ভর করছে দেশটির আদালতের ওপর। রাজনৈতিক দলগুলোর সংকলিত তথ্য থেকে জানা যায়, অনিশ্চিত অবস্থায় থাকা ২৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম। একই সময়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই ২৭ লাখ মানুষের ভাগ্য অমীমাংসিত রেখেই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপিকে সুবিধা দিতে এমন রায় দেওয়া হয়েছে বলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে খোদ ভারতের অভ্যন্তরে।
নতুন ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৬০৯ জন। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬৩ শতাংশ বা ৪ কোটি ৬ লাখ ৫ হাজার, মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩৪ শতাংশ বা ২ কোটি ১৯ লাখ ১৩ হাজার এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় ৩ শতাংশ বা ১৯ লাখ ৩৩ হাজার। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এককভাবে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট এবং তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ৪৮ দশমিক ০২ শতাংশ ভোট এবং ১৮৪ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনে বিজেপি ৪ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট পেলেও কোনো আসন পায়নি। পরবর্তীকালে ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল এককভাবে ৪৪ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট এবং ২১১ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে বিজেপি পায় ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট এবং ৩টি আসন। এরপর ২০২১ সালের নির্বাচনে ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট এবং ২১৩ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস এবং এই নির্বাচনে আগের তুলনায় বিশাল ভোট অর্জন করে বিজেপি, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং আসন দাঁড়ায় ৭৭টিতে।
ফলে অনেকেই মনে করছেন এবারের নির্বাচনে বিজেপির বিজয় রাজ্যটির ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ মনে করেন, বিজেপি বাংলার ক্ষমতায় আসলে মুসলমান ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে মুসলিমদের ওপর দৈনন্দিন সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এছাড়াও দলটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার, সংসদীয় ও সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা করে থাকে বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।
দল হিসেবে বিজেপি বরাবরই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদকে আশ্রয় করে রাজনীতি করে আসছে। যার উদাহরণ দেখা যায় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিজেপি শাসিত রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরাতে। এরই মধ্যে আসামে বিজেপি শাসিত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যটিতে মুসলমানদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদে বুলডোজার অভিযান পরিচালনা করেছেন। এছাড়াও রাজ্যটিতে সমস্ত সরকারি মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে সাধারণ স্কুলে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এমনকি এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন নির্বাচন কমিশনকে প্রায় ৫ লাখ মুসলিম ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আসাম পুলিশ ও বিএসএফ গভীর রাতে বন্দুক ঠেকিয়ে শত শত মানুষকে জিরো পয়েন্টে নিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছে।
আসাম সরকার জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসেই প্রায় ৩০৩ জন অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আসামে ৫০ হাজারের বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই মুসলিম। ২০২৬ সালের শুরু থেকে মে মাস পর্যন্ত যে তিন হাজারের বেশি পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে, তার মধ্যেও প্রায় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি মুসলিম পরিবার বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন ঘটনার মধ্যেই এবার আসামের বিধানসভা নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বিজেপি শাসিত সরকার। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এই রাজ্যটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানের কোনো আশাই নেই।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে বিজেপির বিজয় পশ্চিমবঙ্গেও একই ধারার সূচনা করবে। নির্বাচনের আগে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ জানিয়েছেন, তৃণমূলের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সীমান্ত সিল করে দেওয়া হবে এবং কোনো অনুপ্রবেশকারীকে রাজ্যে থাকতে দেওয়া হবে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সভায় বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, যেমনভাবে উত্তরপ্রদেশ থেকে অপরাধীদের সাফ করা হয়েছে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনুপ্রবেশকারীদের বুলডোজার দিয়ে সাফ করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, তৃণমূল সরকার শুধু একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের তোষণ করছে, যার ফলে ভূমিপুত্র হিন্দুরা আজ বিপন্ন। এমনকি তিনি ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়াকে ‘পরিষ্কার অভিযান’ হিসেবেও সমর্থন করেছেন।
বিজেপি নেতারা বরাবরই সিএএ ও এনআরসি চালু করে অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্তে পুশ-ইন করার কথা বলে আসছেন। যার ফলে রাজ্যটিতে অনেক বৈধ মুসলিম নাগরিক তাদের নাগরিকত্ব হারাতে পারেন। এছাড়াও ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করার কথা বলা হয়েছে বিজেপির নির্বাচনী ইশতাহারে। পাশাপাশি বিজেপি তাদের ইশতেহারে ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার কথা বলেছে। এর ফলে মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইন যেমন—বিবাহ, তালাক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়মগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
বিজেপি নেতারা বরাবরই তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ আনছেন, এমন অবস্থায় রাজ্যটিতে তৃণমূল সরকারের চালু করা ইমাম-মোয়াজ্জিন ভাতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বিভিন্ন অনুদান ও স্কলারশিপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আরেকটি আশঙ্কার জায়গা হলো আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণ স্কুলে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিজেপি সরকার, এছাড়া মুসলিমদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব বা জমায়েতের ওপর বাড়তি নজরদারির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
এমন অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি শাসন বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের শরণার্থী সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার প্রভাব পড়বে সীমান্ত বাণিজ্যসহ বিএসএফ-এর আচরণেও, যদিও নির্বাচিত সরকার দুই দেশের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে রাজ্যটিতে সংখ্যালঘু ও সীমান্ত ইস্যুতে বিজেপির আচরণ এই প্রচেষ্টায় একটি বড় প্রভাব রাখবে।