বেসরকারি খাতের দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির অন্দরে এক লুণ্ঠনের মহোৎসবের পর্দা ফাঁস করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেখানে রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায়, আর প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ চেয়ারে বসে বোনা হয়েছে মানুষের আমানত লোপাটের এক মাস্টার ‘ব্লুপ্রিন্ট’। অভিযোগের তীর যার দিকে, তিনি আর কেউ নন, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আবু জাফর। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের দালিলিক প্রমাণ নাগরিক প্রতিদিনের হাতে এসেছে। এ যেন কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। এই মহাজালিয়াতির উৎস সন্ধানে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের ‘অনুসন্ধান টিম’ মাঠে নামিয়েছে দুদক।
শুরু ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বরের এক পড়ন্ত বিকেলে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ৪টা বেজে ৯ মিনিট। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে মেসেজ বোর্ডের মাধ্যমে এক জরুরি বার্তা আসে প্রিমিয়ার ব্যাংকে। আদেশ স্পষ্ট—ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. এইচ. বি. এম. ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক হিসাব তৎক্ষণাৎ ‘ফ্রিজ’ বা অবরুদ্ধ করতে হবে।
আইনের চোখে তখন শিকল পড়ার কথা। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে তখন চলছিল অন্য হিসাব। ঠিক তিন ঘণ্টা ১৬ মিনিট পর, যখন সন্ধ্যা ৭টা বেজে ২৫ মিনিট, ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেনের সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এক অলৌকিক ইশারায় খুলে গেল সিন্দুকের দরজা। সাবেক এমডি মোহাম্মদ আবু জাফর, এএমডি সৈয়দ নৌশের আলী ও ক্যামেলকো প্রধান শামসুদ্দিন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ মদদে অবরুদ্ধ সেই অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেওয়া হলো এক কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আশ্চর্যের বিষয়, যাদের অ্যাকাউন্ট থেকে এই টাকা বের হয়ে গেলো, তারা তখন দেশের সীমানার বাইরে!
পরবর্তীতে এই দুঃসাহসের জন্য বিএফআইইউ ব্যাংকটিকে সমপরিমাণ টাকা জরিমানা করে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আদায়ের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সাবেক এমডি সেই জরিমানার অর্থ নিজের পকেট থেকে না দিয়ে, ব্যাংকের ‘জেনারেল লেজার’ বা সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকা থেকে পরিশোধ করেন। অর্থাৎ, অপরাধ করলেন কর্তারা, আর তার খেসারত দিল সাধারণ মানুষ!
লুণ্ঠনের খেলা এখানেই থামেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্ট বলছে, বিজ্ঞাপনের চটকদার আলো, উপহারের মোড়ক কিংবা অফিস সংস্কারের খেরোখাতায় কোনো টেন্ডার ছাড়াই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শত শত কোটি টাকা। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে, মাত্র তিন মাসেই ব্যাংকের খাতা থেকে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে ২১ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। কোনো কাজ না করেই, স্রেফ ভুয়া ভাউচারের জাদুবলে এই টাকা ক্যাশ করে পকেটে ভরা হয়েছে। আর এই অর্থ লোপাটের জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কিছু কাগজ বা ‘শেল কোম্পানি’কে। মিউন্ডটি লিমিটেড, মাইন্ডফ্রি লিমিটেড, নিরভানা ডেভেলপারস, কলার ওয়েব এনহেস কনসট্রাকশনের মতো নামসর্বস্ব সব প্রতিষ্ঠানকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভিনসেন কানসালটেন্সি ও ওয়েস্টান ইঞ্জিনিয়ারসের মতো বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম ভেঙে বেনামি ঋণ দেওয়ার নথিপত্রও এখন দুদকের টেবিলজুড়ে।
দুদকের কাছে জমা পড়া প্রাথমিক অভিযোগের আঙুল আরও গভীরে। বলা হচ্ছে, সাবেক এমডি আবু জাফর কেবল ব্যাংকই চালাননি, চালিয়েছেন স্বৈরাচারী এক পারিবারিক রাজত্ব। নিজেকে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলম ও সাইফুজ্জামান জাভেদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিদেশ সফরের আড়ালে গোপন বৈঠক করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি ৫ আগস্টের পর যখন ব্যাংকিং খাতে নিরপেক্ষতার হাওয়া বইছিল, তখনো তিনি এক বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি আনুগত্যের স্মারক হিসেবে ব্যাংকে ‘মুজিব কর্নার’ টিকিয়ে রেখেছিলেন, যা তার পেশাদারিত্বের নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাবেক এমডি আবু জাফর ফোন রিসিভ করেননি।