সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা—বিদ্যুৎ অপচয় ও গ্রাহক হয়রানি রুখতে বাধ্যতামূলক করতে হবে প্রিপেইড মিটার। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, রাতের অন্ধকারেই যেন বদলে গেল নিয়ম! প্রিপেইড মিটারের পরিবর্তে বহুতল ভবনে বসিয়ে দেওয়া হলো অ্যানালগ ঘরানার ডিজিটাল মিটার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) এক শীর্ষ কর্মকর্তার হাত ধরে টাঙ্গাইলে ঘটে যাওয়া এই অনিয়মের তথ্য উন্মোচন করেছে ‘টিম ব্লুপ্রিন্ট’।
এর আগে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঠিকাদারি বিল জালিয়াতি এবং রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস বদলে প্রমোশন বাগিয়ে নেওয়ার সব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে বিউবোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১, টাঙ্গাইলের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল (দক্ষিণ), চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি টাঙ্গাইলের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কাঞ্চন কুটির এলাকার একটি সাততলা ভবনের। সরকারের বাধ্যতামূলক প্রিপেইড মিটারের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেখানে ডিজিটাল মিটার স্থাপনের অনুমোদন দেন তিনি। সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, টাঙ্গাইল থেকে তার বদলির ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে এই নীতিবহির্ভূত ফাইলটিতে স্বাক্ষর করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রচলিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে এই বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে পকেটে ঢুকেছে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ না হলেও রহস্যজনক কারণে ফাইনাল বিল অনুমোদন করে দিতেন এই কর্মকর্তা।
বিগত সরকারের সময় মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের একজন সক্রিয় ও দাপুটে নেতা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই ম্যাজিকের মতো বদলে যায় তার খোলস! পুরো রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে রাতারাতি নতুন রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন তিনি। আর এই ভোলবদলের পুরস্কার হিসেবেই কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই বাগিয়ে নেন ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রমোশন! স্থানীয় সূত্র ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—এত অভিযোগের পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা এভাবে প্রমোশন পেয়ে যান?
একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে আনোয়ারুল ইসলামের জীবনযাত্রা ও অর্জিত সম্পদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখে চোখ কপালে উঠেছে খোদ সহকর্মীদেরও। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি টাঙ্গাইল সদর এলাকায় অবস্থিত ‘নিউ আয়েশা খানম (র.) হাসপাতালের অন্যতম শীর্ষ শেয়ারহোল্ডার। এছাড়া তার পরিবারের সদস্যদের বিপুল ব্যয়বহুল জীবনযাপন ও অলিখিত সম্পদের পাহাড় নিয়ে এখন এলাকায় নানা গুঞ্জন।
এর আগেও একাধিকবার তার বিরুদ্ধে দাপ্তরিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তা প্রকাশিতও হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই অদৃশ্য হাত আর প্রভাব খাটিয়ে সেই তদন্ত ধামাচাপা দিয়েছেন তিনি।
ডিজিটাল মিটারের অনুমোদন, প্রমোশন বিতর্ক এবং হাসপাতালের বেনামি সম্পত্তি নিয়ে ‘টিম ব্লুপ্রিন্ট’-এর পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বিউবোর ভেতরের এই দুর্নীতির শিকড় কত গভীরে, তা খতিয়ে দেখতে এবং এই কর্মকর্তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।